বিশ্বায়ন এবং বাংলাদেশে ইন্টারনেট গতি

আগের সংবাদ

আজ বুদ্ধ পূর্ণিমা

পরের সংবাদ

খাদ্যের কথা ভাবলে পুষ্টির কথাও ভাবুন

প্রকাশিত হয়েছে: এপ্রিল ২৯, ২০১৮ , ৮:০১ অপরাহ্ণ | আপডেট: এপ্রিল ২৯, ২০১৮, ৮:০১ অপরাহ্ণ

মো. আবুল কালাম

হেলেন কেলার ইন্টারন্যাশনাল, বাংলাদেশ কান্ট্রি অফিস

মাতৃত্বকালীন পুষ্টির অবস্থা উন্নয়নে আমাদের কাজের অংশ হিসেবে আমাদের সব কিশোরী এবং নারীর পুষ্টি চাহিদার প্রতি গুরুত্ব দিতে হবে। আমাদের ‘খাদ্যের কথা ভাবলে পুষ্টির কথাও ভাবুন’ প্রতিপাদ্যটি গ্রহণ করতে হবে সব নারী এবং সব সময়ের জন্য। আর এটা গ্রহণ করতে হবে একটি গৃহস্থালির সব সদস্যের এবং ভবিষ্যতের অনাগত প্রজন্মের জন্য পর্যাপ্ত পুষ্টি নিশ্চিত করতে।

অধিক হারে খাদ্য অনিরাপত্তা দূরীকরণে বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা রয়েছে। ২০১৭ সালে প্রাকৃতিক দুর্যোগে জর্জরিত হওয়া সত্তে¡ও গত পাঁচ বছরে জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে খাদ্যের প্রতুলতা লক্ষ করা গেছে। উচ্চতর দারিদ্র্যসীমার নিচে অবস্থানকারী গৃহস্থালির সংখ্যা ২০১০ সালে শতকরা ৩২ শতাংশ থেকে ২০১৬ সালে শতকরা ২৪ শতাংশে নেমে এসেছে। যার অর্থ হলো অধিকাংশ গৃহস্থালির খাদ্য ক্রয়ের ক্ষমতা বেড়েছে। এই পরিবর্তনগুলোর প্রতিক্রিয়ায় গৃহস্থালির রান্নাঘরের ব্যবস্থাপকদের মধ্যে খাদ্য অনিরাপত্তা সংক্রান্ত আচরণের পরিবর্তন ২০১১ সাল থেকে লক্ষ করা গেছে। দুই-তৃতীয়াংশের বেশি (৬৯%) তথ্যদাতা বলেন, গৃহস্থালির সদস্যদের খাবার দিতে তারা অনেক উদ্বিগ্ন। ২০১৪ সালে দেখা যায় যে, এক-চতুর্থাংশ (২৫%) মানুষ খাবার নিয়ে এ ধরনের উদ্বিগ্নতার মধ্যে রয়েছেন। ২০১১ সালে প্রায় অর্ধেক গৃহস্থালি কম পরিমাণে খাবার খায় যা ২০১৪ সালে তা শতকরা ১৫ ভাগে কমে আসে।

গৃহস্থালি পর্যায়ে এ ধরনের উন্নতি সত্ত্বেও অর্যাপ্ত খাবার খাওয়া নারীর অনুপাত শতকরা ৬১ ভাগ (২০১১ সাল) থেকে মাত্র শতকরা ৫৪ ভাগে (২০১৪) নেমে এসেছে। তা ছাড়া গর্ভবতী ও দুধদানকারী নারীরা ভালো খাবার খায়, এমন তথ্য খুব বেশি নেই। কিন্তু এই দুই সময়ে নারীদের শক্তিবর্ধক ও পুষ্টিযুক্ত খাবার খাওয়া জরুরি। গর্ভকালে এবং দুধ খাওয়ানোর সময় পর্যাপ্ত পরিমাণে এবং পর্যাপ্ত গুণাগুণযুক্ত খাবার না খাওয়া শুধু নারীর স্বাস্থ্যের ওপর নয় বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপরও এর প্রভাব পড়ে। উন্নত পুষ্টিযুক্ত খাবার এবং স্বাস্থ্যের ফলাফলে খাদ্য নিরাপত্তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রভাব না ফেলার পেছনে অনেক কারণ রয়েছে কিন্তু ভালো খাবার খাওয়ার ক্ষেত্রে নারীরা নানামুখী সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি হয়। খাদ্য অনিরাপদ গৃহস্থালির ক্ষেত্রে এটা খুব স্বাভাবিক যে, নারীরা তার নিজের খাবারটি গৃহস্থালির অন্যান্য সদস্যকে খেতে দেয়।

গৃহস্থালিতে খাবার কম থাকার কারণে ২০১৪ সালে গৃহস্থালির এক বা একাধিক সদস্যরা কম খাবার খায়। গৃহস্থালির অন্যান্য সদস্যের তুলনায় কিশোরী এবং নারীর মধ্যে কম খাবার গ্রহণ করার প্রবণতা বেশি। গৃহস্থালির প্রায় ৪০ ভাগ সদস্য কিশোর-কিশোরী এবং পূর্ণবয়স্ক নারী দ্বারা গঠিত এবং তারা তাদের খাবার গৃহস্থালির অন্যান্য সদস্যকে দিয়ে দেয় যা খাবার দিয়ে দেয়ার ক্ষেত্রে অন্যান্য সদস্যের তুলনায় তারা দুই-তিন গুণ বেশি। এটা হলো সমাজের একটি প্রথা যা নারী ও পুরুষ উভয়ই বিশ্বাস করে যে, পরিবারের জন্য নারীরাই তাদের জীবন উৎসর্গ করবে। দুর্ভাগ্যবশত এ ধরনের নীতি তাদের ভুল পথে পরিচালিত করে যার ফলে নারী ও কিশোরীদের অপুষ্টি ফলে মূলত ভবিষ্যৎ, অনাগত সন্তান এবং শিশুর ক্ষতি হয়।

খাদ্যে নিরাপদ গৃহস্থালিতেও দেখা যায় যে, ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থা যেমন গর্ভকালীন ও দুধদান করার সময়ও নারীরা পর্যাপ্ত সেবা পায় না। যদিও গত এক বছরে গর্ভবতী নারীদের মধ্যে প্রসব-পূর্ব সেবা পাওয়ার অনুপাত বেড়েছে (খাদ্য নিরাপত্তা পুষ্টির তত্ত্বাবধান/পর্যবেক্ষণ প্রকল্প [এফএসএনএসপি] ২০১১ সালে শতকরা ৭৫ ভাগ থেকে ২০১৪ সালে শতকরা ৮৫ হয়েছে এবং বাংলাদেশ জনসংখ্যা এবং স্বাস্থ্য জরিপ [বিডিএইচএস] ২০০১-২০০৮ এবং ২০১১-২০১৪ সালে শতকরা ৫৮ থেকে শতকরা ৭৮ ভাগ হয়েছে) কিন্তু ভালো খাবার খায় এমন নারীর সংখ্যার খুব বেশি পরিবর্তন হয়নি। অধিকন্তু ২০১৪ সালে মাত্র এক-তৃতীয়াংশ নারী বলেন যে, তারা আয়রন ফলিক এসিড সেবন করেছেন। অধিকাংশ নারী বলেন যে, গর্ভকালীন সময়ে তারা বেশি বিশ্রামও নিয়েছেন কিন্তু ২৫ ভাগের কম নারী বলেছেন তারা বেশি খাবার খেয়েছেন এমনকি তিন মাসকালেও তারা বেশি খাবার খেয়েছেন। এ ধরনের তথ্যের মাধ্যমে প্রমাণিত হয় যে, গর্ভবতী নারীরা যে পরিমাণ খাবার খায় তা অগর্ভবতী নারীরা যে পরিমাণ খাবার খায় তা বস্তুত একই রকমের।

যদিও এফএসএনএসপির তথ্যমতে, বিপজ্জনক অপুষ্ট গর্ভবতী নারীর সংখ্যা ২০১১ সালের শতকরা ২৭ ভাগ থেকে ২০১৪ সালে শতকরা ১৮ ভাগে কমেছে, কিন্তু দেশজুড়ে অপুষ্ট হওয়ার মাত্রা ভিন্ন। বাস্তবিকভাবে সিলেটের শতকরা ৪০ ভাগ নারী অপুষ্ট এবং বিডিএইচএস গণনা- ২০১৪ অনুযায়ী সিলেট হলো দেশের সর্বোচ্চ প্রজননক্ষম এলাকা। ২০১০ এবং ২০১৬ সালে মাতৃত্বকালীন মৃত্যুর সংখ্যা কমে যাওয়ার পেছনে পুষ্টি কি ধরনের ভূমিকা ছিল তা অজানা।

এই অবস্থার উন্নয়নের জন্য কর্মসূচিগুলোতে পূর্ণাঙ্গভাবে কাজ করতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রে সম্পন্ন করা ইমোরি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক এক গবেষণা থেকে দেখা যায় যে, গ্রাম ও শহরের যেসব গৃহস্থালিতে বিবাহিত নারীর কর্তৃত্ব আছে সেসব গৃহস্থালি এবং ব্যক্তি পর্যায়ে ভালো খাদ্যাভ্যাস রয়েছে। উভয় ক্ষেত্রেই নারীর শিক্ষা খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে যুক্ত, এমনকি সম্পদের নিয়ন্ত্রণ, শহরে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে এবং গ্রামীণ এলাকায় একজন নারী তার স্বামীর সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে শিক্ষার বিষয়টি যুক্ত।

মাতৃত্বকালীন পুষ্টির অবস্থা উন্নয়নে আমাদের কাজের অংশ হিসেবে আমাদের সব কিশোরী এবং নারীর পুষ্টি চাহিদার প্রতি গুরুত্ব দিতে হবে। আমাদের ‘খাদ্যের কথা ভাবলে পুষ্টির কথাও ভাবুন’ প্রতিপাদ্যটি গ্রহণ করতে হবে সব নারী এবং সব সময়ের জন্য। আর এটা গ্রহণ করতে হবে একটি গৃহস্থালির সব সদস্যের এবং ভবিষ্যতের অনাগত প্রজন্মের জন্য পর্যাপ্ত পুষ্টি নিশ্চিত করতে।

এই নিবন্ধটি ন্যাশনাল ইনফরমেশন প্ল্যাটফর্ম ফর নিউট্রিশন, ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের আর্থিক সহায়তায় প্রস্তুত করা হয়েছে। এই নিবন্ধে যেসব তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে তা ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের অফিসিয়াল মতামতকে প্রতিফলন করে না।

মো. আবুল কালাম : হেলেন কেলার ইন্টারন্যাশনাল, বাংলাদেশ কান্ট্রি অফিস।