বন্ধুদের সঙ্গে নিয়ে মেয়েকে ধর্ষণ করল বাবা!

আগের সংবাদ

পর্যটনের নতুন দিগন্ত

পরের সংবাদ

ভাষাসৈনিক শওকত আলী

প্রকাশিত হয়েছে: এপ্রিল ১৯, ২০১৮ , ৭:৪৫ অপরাহ্ণ | আপডেট: এপ্রিল ১৯, ২০১৮, ৭:৪৫ অপরাহ্ণ

এম আর মাহবুব

নির্বাহী পরিচালক, ভাষা আন্দোলন গবেষণাকেন্দ্র ও জাদুঘর

 

রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন, স্বাধিকার আন্দোলন ও স্বাধীনতা আন্দোলনে শওকত আলী একটি স্মরণীয় নাম। ঢাকার ১৫০ নং মোগলটুলিতে ১৯১৮ সালের ২০ এপ্রিল শওকত আলী জন্মগ্রহণ করেন।

তিনি পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতাদের একজন। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু। তাঁর মোগলটুলির বাসস্থানটি ছিল ভাষা আন্দোলন, স্বাধিকার ও স্বাধীনতা আন্দোলনের কর্মীবাহিনীর মিলনক্ষেত্র। বিভাগ-পূর্বকালে ঢাকার ১৫০ নং মোগলটুলিতে স্থাপিত হয়েছিল ‘ওয়ার্কার্স ক্যাম্প’ ও মুসলিম লীগ পার্টি হাউস। তখন এখানেই সে সময়ের প্রগতিশীল ছাত্র-যুবক ও রাজনৈতিক কর্মী মিলিত হতেন।

১৫০ নং মোগলটুলির কর্মীরা ভাষা আন্দোলনে সম্পৃক্ত ছিলেন। ভাষা আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক কার্যক্রম এখান থেকেই পরিচালিত হত। ১৫০ মোগলটুলির মূল তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন শওকত আলী। এ প্রসঙ্গে বাহাউদ্দিন চৌধুরী বলেন, ‘সাতচল্লিশে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরও ১৫০ মোগলটুলি বিরোধী রাজনীতির সূতিকাগার হিসেবে দায়িত্ব পালন করে। কলকাতা থেকে শেখ মুজিবুর রহমান, জহিরুদ্দিন, নাঈমুদ্দীনের মতো নেতারা প্রথমে ১৫০ মোগলটুলি পার্টি হাউসের তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন। বাড়িভাড়া থেকে শুরু করে সার্বক্ষণিক বসবাসকারী পার্টি কর্মীদের খাওয়া-দাওয়া ইত্যাদি সব ব্যবস্থাই তিনি করতেন।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তে লিখিছেন ‘…১৫০ নম্বর মোগলটুলিতে প্রথমে উঠব ঠিক করলাম। শওকত মিয়া মোগলটুলি অফিসের দেখাশোনা করে। মুসলিম লীগের পুরনো কর্মী। আমার বন্ধুও। …. শামসুল হক সাহেব ও শওকত সাহেব আমাকে পেয়ে খুবই খুশি। শওকত আমাকে নিয়ে কি যে করবে ভেবেই পায় না। তার একটা আলাদা রুম ছিল। আমাকে তার রুমেই জায়গা দিল। আমি তাকে শওকত ভাই বলতাম।’

ভাষা আন্দোলনের সব অধ্যায়ে শওকত আলী অত্যন্ত ঘনিষ্ঠভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন এবং নেতৃত্ব দিয়েছেন। ১৯৪৭ সালে ভাষা আন্দোলনের সূচনাপর্ব থেকেই তিনি সক্রিভাবে এ আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন। ১৯৪৭ সালের ৩০ ডিসেম্বর তৎকালীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সন্নিকটে রশিদ বিল্ডিংয়ে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে প্রথম রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। ওই বৈঠকে শওকত আলী উপস্থিত ছিলেন এবং সংগ্রাম পরিষদের অন্যতম সদস্য নির্বাচিত হন।

২ মার্চ ১৯৪৮ তারিখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক হলে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ পুনর্গঠনের লক্ষ্যে কমরুদ্দীন আহমদের সভাপতিত্বে যে বৈঠক হয়, শওকত আলী সে বৈঠকে যোগদান করেন। অতঃপর সেদিন দ্বিতীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়, তাতে তিনি অন্যতম সদস্যরূপে অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।

১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ সংগ্রাম পরিদ দেশব্যাপী হরতাল আহ্বান করে। শওকত আলী হরতাল কর্মসূচি পালনের প্রস্তুতি পর্বের প্রতিটি স্তরে অংশগ্রহণ করেন। হরতাল চলাকালে যে সব নেতা ঢাকার রাজপথে অত্যন্ত বলিষ্ঠ ভ‚মিকা পালন করেছেন শওকত আলী তাদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হন। তিনি সবচেয়ে বেশি পুলিশি নির্যাতনের শিকার হন।

১১ মার্চের হরতালে শওকত আলী পুলিশি নির্যাতনে আহত হবার ফলে এক পর্যায়ে তাকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রিকশাযোগে হাসপাতালে নিয়ে যান। ১৫ মার্চ রাষ্ট্রভাষা চুক্তি স্বাক্ষরের পর চুক্তির শর্তানুসারে ভাষা আন্দোলনের দায়ে বন্দিদের মুক্তি দেয়া হয়। মুক্তি পেয়ে শওকত আলী ও শেখ মুজিবুর রহমান রাতে ১৫০ নম্বর মোগলটুলিতে ফিরে আসেন এবং পরদিন অর্থাৎ ১৬ ফেব্রুয়ারি আবারো আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েন। ১৬ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সভাপতিত্বে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে ছাত্রসভা এবং ছাত্রসভার পর অ্যাসেমব্লি ভবন অভিমুখে মিছিল হয়, ওই জনসভা ও মিছিলে শওকত আলী সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। পিকেটিং করার এক পর্যায়ে পুলিশের লাঠিচার্জে তিনি আহত হয়ে মাঠিতে লুটিয়ে পড়েন এবং অজ্ঞান হয় যান। পরে পলাশী ব্যারাকের কর্মচারী ও সংগ্রামী জনতা তাকে হাসপাতালে নিয়ে যান।

১৯৫২ সালের ৩১ জানুয়ারি ঢাকা বার লাইব্রেরি হলে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক সর্বদলীয় বৈঠকে কাজী গোলাম মাহবুবকে আহ্বায়ক করে যে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়, শওকত আলী ওই সংগ্রাম পরিষদের অন্যতম সদস্য ছিলেন।

ভাষা আন্দোলনে নেতৃত্বদানের অপরাধে শওকত আলী ২ মার্চ ১৯৫২ তারিখে গ্রেপ্তার হন। পরবর্তীকালে জাতীয় ইতিহাসের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাবলির সঙ্গে শওকত আলীকে সম্পৃক্ত থাকতে দেয়া যায়। তিনি ভাষা আন্দোলন, স্বাধিকার ও স্বাধীনতা আন্দোলনের অকুতোভয় সৈনিক ছিলেন। ভাষা আন্দোলন ও স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতাকর্মীদের অনেক বৈঠক, গোপন আলোচনা ইত্যাদি শওকত আলীর বাসভবনের অনুষ্ঠিত হয়েছিল। তিনি জাতির গর্বিত সন্তানের একজন। শওকত আলী ১৯৭৫ সালের ১৮ আগস্ট ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন। ভাষা-আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য ২০১১ সালে সরকার তাকে মরণোত্তর একুশে পদক প্রদান করেন এবং ঢাকায় তার নামে একটি রাস্তার নামকরণ করা হয়েছে। আজ ভাষাসৈনিক শওকত আলীর শততম জন্মবার্ষিকী। তার প্রতি আমাদের গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি।

এম আর মাহবুব : নির্বাহী পরিচালক, ভাষা আন্দোলন গবেষণাকেন্দ্র ও জাদুঘর।