আজ বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আবদুর রউফের ৪৬তম শাহাদাত বার্ষিকী

আগের সংবাদ

ছেলের খোঁজে ডিবি কার্যালয়ে ২ মাস

পরের সংবাদ

রমজানে ভোগ্যপণ্যের বাজার

পর্যাপ্ত মজুদ সত্ত্বেও দাম বাড়ার আশঙ্কা

প্রকাশিত হয়েছে: এপ্রিল ৮, ২০১৮ , ১১:৪৯ পূর্বাহ্ণ | আপডেট: এপ্রিল ৮, ২০১৮, ১১:৪৯ পূর্বাহ্ণ

ভোগ্যপণ্যের দাম বাড়বে না, ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে এমন আশ্বাস দেয়া হয়েছে। আবার সরকারের পক্ষ থেকেও ভোক্তাদের আশ্বস্ত করা হয়েছে জিনিসপত্রের দাম নিয়ন্ত্রণের মধ্যে থাকবে। কিন্তু এক ধরনের অসাধু ব্যবসায়ী রমজান সামনে রেখে ভোগ্যপণ্যের মজুদ শুরু করেছে। ইতোমধ্যে বাজারে কিছু পণ্যে দুই-তিন টাকা করে দাম বেড়েছে।

মে মাসের মাঝামাঝি রমজান শুরু হওয়ার কথা। সেই হিসেবে এখনো বাকি প্রায় দেড় মাস। কিন্তু জানুয়ারি মাস থেকেই রমজাননির্ভর পণ্য আমদানি ও মজুদ শুরু হয়ে গেছে। রমজানকে সামনে রেখে প্রতি বছরই ভোগ্যপণ্যের বাজারে একই চিত্র দেখা যায়। অবশ্য খুচরা ব্যবসায়ীরা বলছেন, এ বছর সরকারি মনিটরিং অনেক বেশি হচ্ছে। তাই জিনিসপত্রের দাম তেমন বাড়ার আশঙ্কা নেই। তবে সিন্ডিকেট এবং মজুদদারির মাধ্যমে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে প্রতি বছরের মতো এবারো রমজানে ভোগ্যপণ্যের দাম বাড়ানোর আশঙ্কা করছেন সাধারণ ব্যবসায়ীরা। বিশেষ করে রমজানে ছোলা, চিনি ও ভোজ্যতেলের দাম নিয়েই বেশি কারসাজি চলে। এ অবস্থায় মজুদদারি ঠেকাতে রমজানের আগেই বাজার মনিটরিংয়ের কথা বলছেন তারা। কারণ রমজানে সবচেয়ে বেশি চাহিদা তৈরি হয় এমন পাঁচ পণ্য ছোলা, ডাল, চিনি, ভোজ্যতেল ও খেজুর। আর এসব নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্য নিয়ে চলে ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের কারসাজি। পর্যাপ্ত আমদানি সত্ত্বেও কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেয় এসব ব্যবসায়ী। পুরো রমজান মাসে বাংলাদেশে চিনির চাহিদা থাকে প্রায় চার লাখ টন। এ ছাড়া ভোজ্যতেলের চাহিদা থাকে সোয়া দুই লাখ টন ও ছোলা দেড় লাখ টন। কাস্টম হাউসের তথ্যমতে, ইতোমধ্যে সাড়ে চার লাখ টন চিনি, ১৫ লাখ টন ভোজ্যতেল এবং পাঁচ লাখ টন ছোলা আমদানি হয়েছে। তারপরও রয়ে যাচ্ছে সিন্ডিকেট ব্যবসায়ীদের মজুদদারির আশঙ্কা।

বাংলাদেশ ট্যারিফ কমিশন (বিটিসি) সম্প্রতি ভোজ্যতেল, চিনি, মসুর ডাল, ছোলা, পেঁয়াজসহ বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানি, আন্তর্জাতিক বাজারদর ও দেশের বাজারদরের পরিস্থিতি নিয়ে একটি প্রতিবেদন তৈরি করেছে। এতে দেখা যায়, দেশের চাহিদার তুলনায় এসব পণ্যের আমদানি স্বাভাবিক। কোনো কোনো ক্ষেত্রে আমদানি বেশি। এদিকে এবার রমজানে খোলাবাজারে ৭ হাজার ১০০ টন পণ্য বিক্রি করবে বলে জানিয়েছে ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি)। রোজায় দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ এবং স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য ন্যায্যমূল্যে খাদ্য পণ্য সরবরাহ করবে ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি)। মসুর ডাল, চিনি, তেল, খেজুর ও ছোলা এই পাঁচটি পণ্য ন্যায্যমূল্যে বিক্রি করবে রাষ্ট্রীয় এ সংস্থাটি। টিসিবির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, প্রতিবছরের মতোই এ বছরও রোজার ৭ থেকে ১০ দিন আগে সারা দেশে ট্রাকে করে নিত্যপ্রয়োজনীয় পাঁচটি পণ্য ন্যায্যমূল্যে বিক্রি করা হবে। টিসিবি সূত্র জানায়, এ বছর খোলাবাজারে বিক্রির জন্য ২ হাজার টন চিনি ও দেড় হাজার টন তেল দেশের অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে দরপত্রের মাধ্যমে সংগ্রহ করা হয়েছে। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক বাজার থেকে ২ হাজার টন ছোলা ও দেড় হাজার টন মসুর ডাল কেনা হয়েছে। এসব পণ্য আসছে অস্ট্রেলিয়া থেকে। আর অন্য পণ্য খেজুর অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে ক্রয় প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। এ বছর ১০০ টন খেজুর কেনা হবে বলে জানা গেছে। সূত্র মতে, দেশে বছরে ছোলার চাহিদা প্রায় ১ লাখ টন। এর মধ্যে শুধু রমজানেই চাহিদা থাকে প্রায় ৮০ হাজার টন। বাংলাদেশ ব্যাংক ও চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউসের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের (২০১৭-১৮) প্রথম ৮ মাসে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে ছোলা আমদানি হয়েছে ৪৯ হাজার ৬১৮ টন। এর মধ্যে শুধু গত দুই মাসেই আমদানি হয়েছে ৩৪ হাজার টন। জানুয়ারিতে প্রায় ১৮ হাজার এবং ফেব্রুয়ারিতে ১৬ হাজার টন ছোলা আমদানি হয়েছে। সামনের দেড় মাসে আরো ২৫ থেকে ৩০ হাজার টন আমদানি হতে পারে। ব্যবসায়ীরা জানান, চট্টগ্রাম বন্দর ছাড়াও টেকনাফ স্থলবন্দর দিয়ে মিয়ানমার থেকে ছোলা আমদানি হয়। এ ছাড়া গত বছর আমদানি করা বিপুল পরিমাণ ছোলা এখনো রয়ে গেছে ব্যবসায়ীদের গুদামে। গত অর্থবছরের (২০১৬-১৭) প্রথম ৮ মাসে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে ছোলা আমদানি হয়েছিল ১ লাখ ৫১ হাজার ১৬১ টন, যা চলতি অর্থবছরের একই সময়ের তিনগুণ। সব মিলিয়ে ছোলার সরবরাহে সংকটের আশঙ্কা নেই। তারা জানান, আন্তর্জাতিক বাজারে মানভেদে ছোলার দাম কেজিতে ১০ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত কমেছে। মসুর ডালের আমদানিও গত দুই মাসে বেড়েছে। জানুয়ারিতে ১৫ হাজার টন এবং ফেব্রুয়ারিতে ১৩ হাজার টন মসুর ডাল চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে আমদানি করেছেন ব্যবসায়ীরা।

তথ্যমতে, চলতি অর্থবছরের প্রথম ৮ মাসে খেজুর আমদানি হয়েছে ৩৬ হাজার ৪৮৯ টন যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ১৮ হাজার ৯২৭ টন বেশি। ২০১৬-১৭ অর্থবছরের একই সময়ে খেজুর আমদানি হয়েছিল ১৭ হাজার ৫৬২ টন। অথচ চলতি বছরের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি এ দুই মাসেই কেবল খেজুর আমদানি হয়েছে ২২ হাজার টন। দেশে বছরে খেজুরের চাহিদা প্রায় ২০ হাজার টন, যার মধ্যে শুধু রমজানেই চাহিদা থাকে ১৮ হাজার টন। চলতি বছরের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে অপরিশোধিত চিনি এসেছে ১ লাখ ১০ হাজার ৪৯১ টন। একই সময়ে পরিশোধিত চিনি আমদানি হয়েছে ৫২ হাজার টন। প্রায় দেড় লাখ টন পরিশোধিত ও অপরিশোধিত চিনি আসার অপেক্ষায় রয়েছে। অর্থাৎ হিসাব অনুযায়ী গত অর্থবছরে চাহিদার তুলনায় অনেক বেশি পণ্য আমদানি করা হয়েছে। যা মজুদ রয়ে গেছে। এ ছাড়া চলতি বছরও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানি বেড়েছে। সেইসঙ্গে পণ্যগুলোর আন্তর্জাতিক বাজার দরও পড়তির দিকে। ফলে আগামী পবিত্র রমজান মাসে বাড়তি চাহিদা তৈরি হলেও দাম বাড়ার কোনো কারণ নেই। তবে অতীতের অভিজ্ঞতায় সংশ্লিষ্টদের দাবি, নানা কারসাজি করে রোজায় যে কোনো দুইটি বা তিনটি পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেন ব্যবসায়ীরা। এবার যাতে তা না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। এ ব্যাপারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানিকারকরাও বলছেন, গত রোজার চেয়ে এ বছর পণ্যের দাম আন্তর্জাতিক বাজারে কম। তবে তাদের চিন্তা ডলারের দাম, ব্যাংকের ঋণের সুদের হার ও চট্টগ্রাম বন্দরের পণ্যজট নিয়ে।

উল্লেখ্য, সম্প্রতি আমদানি অনেক বেড়ে যাওয়ায় ডলারের সরবরাহে টান পড়েছে। এতে টাকার বিপরীতে মার্কিন এই মুদ্রার দাম বেড়েছে। তা ছাড়া আমদানি-রপ্তানির চাপে চট্টগ্রাম বন্দরে পণ্য খালাসে সময় বেশি লাগছে। বন্দরে জটের কারণে জাহাজ জেটিতে ভিড়তে দীর্ঘ সময় লাগছে। এতে পণ্যের আমদানি খরচ বাড়ছে। পাশাপাশি সময়মতো পণ্য হাতে পাচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা, যা সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটাচ্ছে। আবার মিয়ানমার থেকে আমদানিকৃত পণ্য টেকনাফ থেকে ঢাকা পর্যন্ত আনতে আগের তুলনায় খরচ প্রায় দ্বিগুন বেড়ে গেছে। কারণ আগে এক ট্রাকে ২০ টনের বেশি পণ্য আনতে ভাড়া গুনতে হতো ৪৩ হাজার টাকা। অথচ সরকারের নতুন ঘোষণা অনুযায়ী একই ভাড়ায় এখন ১৩ টন মাল আনা যায়। এর বেশি আনলেই জরিমানা গুনতে হয়।

ট্যারিফ কমিশনের প্রতিবেদনে দেখা যায়, দেশে বছরে প্রায় ১৬ লাখ টন চিনির চাহিদা রয়েছে। এর মধ্যে এক লাখ টনের মতো দেশে উৎপাদিত হয়। গত জুলাই থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আট মাসে দেশে চিনি আমদানি হয়েছে ১৫ লাখ ৬৩ হাজার টন। গত বছরের একই সময়ের আমদানি তথ্য তুলনা করলে দেখা যায়, চলতি বছর চিনি আমদানির পরিমাণ ১৭ শতাংশ বেশি। ট্যারিফ কমিশন বলছে, আন্তর্জাতিক বাজারে গত এক মাসে অপরিশোধিত চিনির দাম ৪ শতাংশ ও এক বছরে ২৫ শতাংশ কমেছে। ট্যারিফ কমিশনের হিসাবে দেশে বছরে এখন ১৫ লাখ টন পরিশোধিত ভোজ্যতেলের চাহিদা আছে। দেশে সরষেসহ প্রায় ২ লাখ টন ভোজ্যতেল উৎপাদিত হয়। বাকিটা আমদানি করা হয়। চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে ১২ লাখ ৭১ হাজার টন পরিশোধিত ও অপরিশোধিত ভোজ্যতেল আমদানি হয়েছে।