পর্যাপ্ত মজুদ সত্ত্বেও দাম বাড়ার আশঙ্কা

আগের সংবাদ

প্রতিশোধ নিতেই পরকীয়ায় জড়ান স্নিগ্ধা ভৌমিক

পরের সংবাদ

ছেলের খোঁজে ডিবি কার্যালয়ে ২ মাস

প্রকাশিত হয়েছে: এপ্রিল ৮, ২০১৮ , ১১:৫৪ পূর্বাহ্ণ | আপডেট: এপ্রিল ৮, ২০১৮, ১১:৫৪ পূর্বাহ্ণ

৬০ ঊর্ধ্ব বৃদ্ধা নসিমন বেগম। ভাড়া থাকেন মগবাজারের নয়াটোলা এলাকায় চেয়াম্যান গলির একটি বাসায়। ছোটবেলা থেকেই অভাব অনটনের সঙ্গে যুদ্ধ কছেন তিনি। বিয়ে হয় মো. ইসলাম নামে এক রিকশাচালকের সঙ্গে। ঘর আলো করে আসে তিন ছেলে। স্বামীর স্বল্প আয় দিয়ে ছেলেদের মানুষ করতে থাকেন। কিন্তু অভাব তার পিছু ছাড়েনি।

ছেলেরা বড় হয়ে মায়ের কষ্ট বুঝতে শুরু করে। অভাবের সংসারে বেশি লেখাপড়ার সুযোগ না পাওয়ায় সবাই কর্মক্ষেত্রে নাম লেখায়। বড় ছেলে বিয়ে করে আলাদা হয়ে যায়। মেজ ছেলে বিয়ে করলেও তার সঙ্গেই থাকতেন। এরই মধ্যে সাড়ে ৩ বছর আগে স্বামী মো. ইসলাম মারা যান। সম্প্রতি মেজ ও ছোট ছেলের আয়ে সংসারে ভালোই কাটছিল ওই বৃদ্ধার দিন। ভেবেছিলেন এভাবেই কাটিয়ে দিবেন বাকিটা জীবন।

কিন্তু পরিবারটির উপর দিয়ে হঠাৎ করে বয়ে যায় দমকা হাওয়া। এক রাতেই সব উলোট-পালোট হয়ে যায়। আবারো সেই অভাবের দিন শুরু হয়। যে নাতি হেসে-খেলে বেড়াত তারও মুখে হাসি ফুড়িয়ে গেছে। বাড়ি ভাড়া দিতে না পারায় বাড়িওয়ালার সঙ্গে ঝগড়া বেধেই থাকে। কোনো

বেলা নুন ভাত জুটলেও পরের বেলা কি খাবেন তার কোনো ঠিক নেই। এমনকি মনেও কোনো শান্তি খুঁজে পান না। পাবেনই বা কিভাবে। যে ছেলেরা কখনো এক কাপ চা খেত না, কারও সঙ্গে আড্ডা দিত না, তাদের ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) পরিচয়ে আটক করে নিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। নিজের ছেলেরা কি অপরাধ করেছেন বা করতে পারেন সে বিষয়ে কিছুই জানেন না বৃদ্ধা। অপরাধ করলে সাজা হোক তাতে কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু বুকের ধন দুই ছেলে জীবিত আছে কিনা- সেটাই জানতে পারেননি। থানায় জিডি করেও কোনো লাভ হয়নি। চোখের সামনে মেজ ছেলেকে ডিবির পোশাক পড়া ৬ দুর্বৃত্ত হ্যান্ডকাফ পড়িয়ে ধরে নেয়ায় ভাবছেন ডিবি অফিসেই আছেন তার ছেলেরা। ডিবি অফিস থেকেই ছেলেরা ফিরবে এমন চিন্তা থেকেই প্রতিদিন ডিবি কার্যালয়ের সামনে বসে থাকেন নসিমন বেগম।

ভোরের কাগজকে তিনি জানান, তার মেজ ছেলের নাম আলম ও ছোট ছেলের নাম সুলতান। আলম গাড়িচালক, সুলতান কারওয়ান বাজার আড়তে কাজ করেন। গত ১৫ ফেব্রুয়ারি রাতে সিভিল পোশাকে অস্ত্র হাতে বাসা থেকে আলমকে ধরে নিয়ে যায় ডিবি পুলিশের ৬ সদস্য। এরপর জানতে পারেন তার ছোট ছেলেকেও ডিবি ধরে নিয়ে গেছে। কিন্তু কারণ জানতে পারেননি। এরপর ডিবি থেকে তাদের কাউকে কিছু জানানো হয়নি। ১৮ ফেব্রুয়ারি রমনা থানায় জিডি করলেও খোঁজ মেলেনি। তার বিশ্বাস, ডিবিতেই আছেন তার ছেলেরা। এজন্য ছেলেদের সন্ধানে প্রতিদিন ডিবি কার্যালয়ের সামনে আসেন। কোর্টে হাজির করানোর জন্য যেসব আসামিদের প্রিজন ভ্যানে তোলা হয় সেখানে ছেলেদের খোঁজেন। কিন্তু এই পর্যন্ত তাদের কোনো সন্ধান পাননি।

নসিমন বেগম বলেন, আলম ১১ ও সুলতান ১০ হাজার টাকা বেতন পেত। ভালোই চলছিল। কিন্তু কি যে হয়ে গেল। এখন ছেলেদেরই খোঁজ পাচ্ছি না। যদি একবার জানতে পারতাম কারাগারে আছে অথবা পুলিশি হেফাজতে জীবিত আছে তাও শান্তি লাগত। আবেগাপ্লুত কণ্ঠে তিনি বলেন, কোথাও ক্রসফায়ারের খবর শুনলে ছুটে যাই ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে। আল্লাহ না করুক যদি ক্রসফায়ারও হয়ে থাকে লাশত পাব। সেটাও পেলাম না। এখন আল্লাহ একমাত্র ভরসা।

সংসার চলছে কিভাবে জানতে চাইলে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন দূরের পানে। কান্না জড়িত কণ্ঠে বলতে থাকেন, আল্লাহ চালাচ্ছে কোনো রকম। ছেলের বউ সারাদিন কান্না করে। বাড়ি ভাড়া ও নাতির স্কুলের বেতন বাকি। যদি ছেলেদের বেঁচে থাকার খবরটা পাইতাম তাহলে এসব কিছু কষ্ট মনে হতো না। ডিবি কার্যালয়ের সামনে এসে লাভ কি? এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, আমার বিশ্বাস- ছেলেরা এখানেই আছে। তাই যতদিন না পাব এখানেই বসে থাকব।

সাংবাদিক পরিচয় দিলে নসিমন বেগম বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে বলেন, পত্রিকায় খবর হইলে পুলিশ যদি আমার ছেলেদের ফেরত না দেয়। অভয় দিলে তিনি বলেন, সিভিল পোশাকে আটক করলে অনেক দিন এখানে আটকে রাখা হয় বলে শুনেছি। তাই এখানে বসে থাকি। যদি পত্রিকায় আসলে আমার ছেলেদের ফেরত পাওয়া যায় তাহলে দেখেন কিছু করতে পারেন কিনা।

জিডির তদন্ত কর্মকর্তা নয়াটোলা পুলিশ ফাঁড়ির এসআই মিজান ভোরের কাগজকে বলেন, থানায় জিডি করার পর থেকেই বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। আমরা ডিবি, র‌্যাবসহ সম্ভাব্য সব জায়গায় খোঁজ নিয়েছি। কিন্তু কোথাও তাদের কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। তবে, তদন্তে মনে হয়েছে তারা বিভিন্ন অপরাধের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিল। আমরা বিষয়টি আরো গভীরভাবে তদন্ত করে দেখছি।