অলির জন্মদিনে মোদীর শুভেচ্ছা

আগের সংবাদ

কাঠমান্ডু বিমান দুর্ঘটনা শোকাবহে কিছু প্রশ্ন তুলে দিল

পরের সংবাদ

লাহিড়ীরহাটের গণহত্যা

প্রকাশিত হয়েছে: মার্চ ১৩, ২০১৮ , ৯:৩৩ অপরাহ্ণ | আপডেট: মার্চ ১৩, ২০১৮, ৯:৩৩ অপরাহ্ণ

লে. কর্নেল (অব.) কাজী সাজ্জাদ আলী জহির

বীরপ্রতীক, স্বাধীনতা পদকপ্রাপ্ত

১৯৭১-এর ২৫ মার্চ পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী বাঙালির স্বাধীনতার আকাক্সক্ষা অঙ্কুরে বিনাশ করতে চেয়েছে নজিরবিহীন গণহত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞে। গণহত্যা ঢাকা থেকে ছড়িয়ে পরবর্তী নয় মাসে সমগ্র বাংলাদেশে অব্যাহত ছিল। মহান মুক্তিযুদ্ধে নিহতের সংখ্যা ৩০ লাখ কিংবা আরো বেশি। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে এ পর্যন্ত পাঁচ হাজারের অধিক বধ্যভূমির সন্ধান পাওয়া গেছে। এর মধ্যে এক হাজার বধ্যভূমি চিহ্নিত। আফসোসের বিষয় স্বাধীনতার ৪৭ বছরে এই বধ্যভূমিগুলো অরক্ষিত রয়ে গেছে। অরক্ষিত উল্লেখযোগ্য বধ্যভূমিগুলো নিয়ে এই ধারাবাহিক রচনা।

১৯৭১ সালের অসহযোগ আন্দোলনের সময় বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে মার্চ মাসের প্রথম থেকেই রংপুরের জনগণ ও ঠিকাদাররা রংপুর সেনানিবাসে অবস্থানরত পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সৈন্যদের সব ধরনের খাদ্য সরবরাহ ও আনুষঙ্গিক সহযোগিতা বন্ধ করে দেন। তখন পাকিস্তান সেনাবাহিনী রংপুর সেনানিবাসের আশপাশের সম্মানীপুর, দামোদরপুর, বড়োবাড়ি ও মনোহরপুর গ্রাম থেকে গরু, ছাগল, হাঁস, মুরগি, ক্ষেতের শাকসবজি বলপূর্বক ছিনিয়ে নিতে শুরু করে। জনগণ এসব কাজে বাধা দিলে পাকিস্তানি সৈন্যরা তাঁদের ওপর অত্যাচার শুরু করে। ফলে এলাকার জনগণও পাকিস্তান সেনাবাহিনীর এসব অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে এর সমুচিত জবাব দেয়ার সুযোগ খুঁজতে থাকেন।

১৯৭১ সালের ২৩ মার্চ একটি জিপে করে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ২৯ ক্যাভালরি রেজিমেন্টের অফিসার লেফটেন্যান্ট আব্বাস ৪ জন সৈন্যকে সঙ্গে নিয়ে সশস্ত্র অবস্থায় সেনানিবাস থেকে রওনা হয়। তারা নিসবেতগঞ্জ হাটের সেতু হয়ে পশ্চিম দিকে লাহিড়ীরহাট ও নজিরের হাটের উদ্দেশে যাত্রা করে। তাদের উদ্দেশ্য নিত্যদিনের মতো জোরপূর্বক খাবার সংগ্রহ করা। নিসবেতগঞ্জ হাটে অবস্থানরত দীর্ঘদিনের শোষিত মানুষ পাকিস্তানি সৈন্যদের আগমন সংবাদ জানতে পারেন। ফলে তাৎক্ষণিকভাবে তাদের মনে বিদ্রোহের আগুন জ্বলে ওঠে। তারা সম্মানীপুর গ্রামের সাহসী যুবক শাহেদ আলী কসাইয়ের নেতৃত্বে পাকিস্তানি সৈন্যদের আক্রমণ করার সিদ্ধান্ত নেন। তাদের সম্মিলিত আক্রমণে পাকিস্তানি সৈন্যরা সেদিন নিহত হয় এবং আহত লেফটেন্যান্ট আব্বাস ২৪ মার্চ সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে মারা যায়।

পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অফিসার ও সৈন্যরা এই আক্রমণের প্রতিশোধ নেয়ার জন্য ২৬ মার্চের পর প্রথমে শাহেদ আলীকে অমানুষিক নির্যাতনের পর হত্যা করে এবং রংপুর সেনানিবাসের আশপাশের গ্রামগুলো জ্বালিয়ে দেয়। এরই ধারাবাহিকতায় ২৮ মার্চ আদিবাসী সাঁওতাল, ওঁরাও, মুণ্ডা ও রংপুর সেনানিবাসের আশপাশের ১৯টি গ্রামের বাসিন্দারা সেনানিবাস আক্রমণ করেন। তবে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ট্যাংক রেজিমেন্ট ও অন্যান্য আধুনিক অস্ত্রের বিরুদ্ধে সেদিন সেনানিবাস দখল করা সম্ভব হয়নি এবং এই আক্রমণে শত শত মানুষ শহীদ হন। তারপর থেকে পাকিস্তান সেনাবাহিনী আরো ক্ষিপ্ত হয়ে রংপুর সেনানিবাস ও এর আশপাশের বেশ কয়েকটি গ্রামে তল্লাশি চালিয়ে নিরীহ জনগণকে জোরপূর্বক ধরে নিয়ে হত্যা করতে থাকে। তার মধ্যে নিসবেতগঞ্জ, দামোদরপুর, পিরজাবাদ, বড়োবাড়ি, মনোহরপুর ও দেওডোবা গ্রামের নাম উল্লেখ করা যেতে পারে। প্রথম দিকে পাকিস্তানি সৈন্যরা রংপুর সেনানিবাসের আশপাশের গ্রাম থেকে নিরীহ জনগণকে ধরে সেনানিবাসের পার্শ্বে ‘বালার খাইল’ নামক স্থানে হত্যা করত। পরবর্তী সময়ে স্থান পরিবর্তন করে তারা সেনানিবাস থেকে ৫/৬ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত লাহিড়ীরহাটের পুকুরপাড়ে নিরীহ গ্রামবাসীদের ধরে নিয়ে গণহত্যা চালাতে থাকে। এর ফলে অধিকাংশ গ্রামবাসী নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে গ্রাম ত্যাগ করতে বাধ্য হন।

৭ মে শুক্রবার, দিনটি ছিল ১২ রবিউল আউয়াল, পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী। এমন একটি দিনে পাকিস্তান সেনাবাহিনী কোনো আক্রমণ করবে না- এমন সরল বিশ্বাসে জুমার নামাজ ও মিলাদ পড়ার উদ্দেশ্যে পালিয়ে যাওয়া অনেক মানুষ নিজ নিজ বাড়িতে ফিরে আসেন। এদিকে পাকিস্তানি সৈন্যরাও এই দিনটিকে সামনে রেখে আক্রমণের পরিকল্পনা করে। পরিকল্পনা মোতাবেক তারা দেওডোবা ও বড়োবাড়ি থেকে শুরু করে দামোদরপুর পর্যন্ত ঘরে ঘরে তল্লাশি করে গ্রামবাসীদের বন্দি করতে শুরু করে। সে সময় বড়োবাড়ি গ্রামের আন্দারু মিয়াজির মসজিদে জুমার নামাজ শেষে মিলাদ মাহফিল অনুষ্ঠিত হচ্ছিল। অতর্কিতে সেখানে ৪টি ট্রাকে করে পাকিস্তানি সৈন্যরা উপস্থিত হয়। তারা ট্রাক থেকে নেমে মসজিদ ঘেরাও করে এবং কয়েকজন সৈন্য মসজিদে প্রবেশ করে মিলাদ পড়ার জন্য অবস্থানরত ৩২ জন মুসল্লিকে পিঠমোড়া করে বেঁধে বলপূর্বক মসজিদ থেকে ধরে নিয়ে যায়। মসজিদের বাকি মুসল্লিদের অনেক কাকুতি মিনতির পরও তাদের ছেড়ে দেয়া হয়নি। ভয়ার্ত মানুষদের আর্ত চিৎকারে বাতাস ভারী হয়ে ওঠে কিন্তু তাদের কান্না বর্বর পাকিস্তানি সৈন্যদের কর্ণকুহরে পৌঁছেনি।

এদিকে বন্দি ৩২ জন মুসল্লিকে রংপুর সেনানিবাস থেকে ৮ কিলোমিটার দূরে লাহিড়ীরহাটের পুকুর পাড়ে আনা হয়। সেখানে তখন হৃদয় বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। পিতা চান ছেলের প্রাণভিক্ষা, আর ছেলে চান পিতার প্রাণভিক্ষা। বন্দিদের মধ্যে একজন ছিলেন বয়োজ্যেষ্ঠ শাহ সেকান্দার আলীর ১২ বছরের ছেলে মিন্টু মিয়া। তিনি তাঁর পিতাকে ছেড়ে দিয়ে তাঁকে হত্যা করার জন্য পাকিস্তানি সৈন্যদের কাছে কান্নাকাটি করে আকুতি জানান। কিন্তু নরপশুদের মন তো গলেইনি বরং তারা পিতার সঙ্গে ছেলেকেও হত্যা করে। তারপর গভীর রাতে তারা একে একে গুলি করে ঝাঁজরা করে দেয় সবার বুক।

লাহিড়ীরহাট-সংলগ্ন শাহবাজপুর গ্রামের বাসিন্দা সাহেব আলী, সাদেক আলী ও কসিম উদ্দিন সেদিন ঘটনাস্থলের পার্শ্ববর্তী জমিতে কাজ করছিলেন। পাকিস্তানি সৈন্যদের গাড়ি আসতে দেখে তাঁরা বাঁশঝাড়ের আড়ালে লুকিয়ে পড়েন। আড়াল থেকে তাঁরা দেখতে পান, পিঠমোড়া করে বাঁধা বন্দি মানুষগুলোকে লাহিড়ীরহাটের পুকুর পাড়ে একটি শ্যাওড়া গাছের নিচে দাঁড় করানো হয়। কিছুক্ষণ পরে গুলির আওয়াজ পাওয়া যায় এবং বন্দিরা চিৎকার করে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। পাকিস্তানি সৈন্যরা স্থান ত্যাগ করার পর তাঁরা আড়াল থেকে বেরিয়ে এসে দেখেন গুলিবিদ্ধ অবস্থায় কয়েকজন মৃত্যু যন্ত্রণায় ‘পানি’ ‘পানি’ বলে কাতরাচ্ছেন। তখন দ্রুত তাঁরা পুকুরের পানিতে গামছা ভিজিয়ে আহতদের কয়েকজনকে পানি খাওয়াতে থাকেন। আহতদের মধ্যে ছিলেন মেম্বার নুরুল আনাম।

হঠাৎ এমন সময় দূরে গাড়ির শব্দ পাওয়া যায়। তাঁরা বুঝতে পারেন যে, পাকিস্তানি সৈন্যরা সবার মৃত্যু হয়েছে কি না সে বিষয়ে নিশ্চিত হওয়ার জন্য পুনরায় সেখানে আসছে। ভয়ে তাঁরা দ্রুত জঙ্গলের মধ্যে লুকিয়ে পড়েন। তখন পর্যন্ত মেম্বার নুরুল আনামসহ কয়েকজন মৃত্যু যন্ত্রণায় ছটফট করছিলেন। পাকিস্তানি সৈন্যরা তখন আহতদের মাথায় বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করে। প্রত্যক্ষদর্শী বৃদ্ধ সাদেক আলী কেঁদে কেঁদে জানান, সুযোগ পেলে হয়তো সেদিন মেম্বার নুরুল আনামকে বাঁচানো সম্ভব হতো। কারণ গুলিবিদ্ধদের মধ্যে তিনি তখন পর্যন্ত কথা বলতে পারছিলেন এবং নিজের পরিচয় দিয়েছিলেন। কিন্তু নরঘাতকরা তাঁদের একজনকেও বাঁচতে দেয়নি।

গণহত্যার পর সেদিন শুধু শহীদ মেম্বার নুরুল আনাম ও শহীদ আজাহার আলীর লাশ শনাক্ত করে স্থানীয় জনগণের সহায়তায় রাতে গরুর গাড়িতে করে তাঁদের বাড়িতে আনা হয়েছিল। পরদিন পারিবারিক কবরস্থানে তাঁদের দাফন করা হয়। অন্য শহীদদের গণকবর হয়েছে লাহিড়ীরহাট বধ্যভূমিতে ও দেওডোবা গ্রামে।

লাহিড়ীরহাটের জনগণ জানান যে, পাকিস্তানি সৈন্যরা পরবর্তী ৭ মাস প্রায় একইভাবে বিভিন্ন গ্রাম থেকে কয়েক হাজার গ্রামবাসীকে ধরে এনে রাতের বেলা লাহিড়ীরহাট বধ্যভূমিতে হত্যা করে মাটিচাপা দিয়ে রেখেছিল। তাদের পরিচয় আজো জানা যায়নি। স্বাধীনতার পর ওই স্থানের বিভিন্ন গর্ত থেকে অসংখ্য মানুষের কঙ্কাল উদ্ধার করে সসম্মানে গণকবরে সমাহিত করা হয়েছে।

৭ মে সংঘটিত নির্মম গণহত্যার সাক্ষী লাহিড়ীরহাটের বধ্যভূমি অযত্ন ও অবহেলায় পড়ে আছে। সেখানে স্থানীয় জনগণ দ্বারা নির্মিত একটি স্মৃতিফলক ছাড়া আর কিছুই নেই। বধ্যভ‚মিতে শহীদদের স্মরণে তাঁদের নাম সংবলিত কোনো স্মৃতিস্তম্ভ নির্মিত হয়নি। ফলে এই বধ্যভ‚মিতে শহীদ শত শত বাঙালির আত্মার হাহাকার, আর্তনাদ ও কান্নার আওয়াজ আজও গুমরে ওঠে। স্থানীয় জনগণের দাবি এই স্থানে যেন সরকারিভাবে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করে শহীদদের নামফলক স্থাপন করা হয়। ১৯৭১ সালের ৭ মে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর হাতে লাহিড়ীরহাটের পুকুরপাড়ে শহীদ ৩২ জনের মধ্যে ৩০ জন শহীদের নাম সংগ্রহ করা সম্ভব হয়েছে।

লে. কর্নেল (অব.) কাজী সাজ্জাদ আলী জহির
বীরপ্রতীক, স্বাধীনতা পদকপ্রাপ্ত