লাহিড়ীরহাটের গণহত্যা

আগের সংবাদ

রাজনীতির গতিধারায় আওয়ামী লীগ ও বিএনপি

পরের সংবাদ

কাঠমান্ডু বিমান দুর্ঘটনা শোকাবহে কিছু প্রশ্ন তুলে দিল

প্রকাশিত হয়েছে: মার্চ ১৩, ২০১৮ , ৯:৩৮ অপরাহ্ণ | আপডেট: মার্চ ১৩, ২০১৮, ৯:৩৮ অপরাহ্ণ

নিখুঁত কারিগরি সতর্কতা ও চূড়ান্ত দক্ষতার সঙ্গে বিমান চালালেও দুর্ঘটনা ঘটতেই পারে ও ঘটবে। কিন্তু তা নিয়ে তদন্তের ভনিতা, রিপোর্ট প্রকাশ না করা, অন্য দেশকে আগেই দায়ী করে বসা এবং সে দেশের বিমান উড্ডয়ন ও অবতরণ ব্যবস্থা নিয়ে আন্তর্জাতিক তদন্তের দাবি না করা পরিবহন নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে ঢিলে করে দেয়। দোষীর শাস্তি হয় না। আবার সব কিছু চলে গড্ডলিকা প্রবাহে। মানুষ সতর্ক হয় না। আবার একটা দুর্ঘটনা ঘটে। আমরা বলি এ তো ঘটবেই, এত ভয় যদি ঘরে বসে থাকো।

মঙ্গলবারের ভর দুপুরে টিভির পর্দায় ভেসে এল ব্রেকিং নিউজ। ৭৮ সিটবিশিষ্ট ইউএস-বাংলার বিমান ৬৭ জন যাত্রী ও ৪ জন ক্রু নিয়ে কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন নারায়ণ বিমানবন্দরে ভেঙে পড়েছে। ৫০ জনের অধিক যাত্রীর প্রাণনাশের খবর আসছে। আশঙ্কা করা হয়েছে। ঘটনাটি শোকাবহ সন্দেহ নেই। মৃত্যু বা দুর্ঘটনা আমাদের কাম্য নয়। আর তা নিয়ে কাটাছেঁড়া বা কাগজ-কলম নিয়ে নিবন্ধ ফাদাও যে খুব একটা সুরুচির পরিচয় তাও নয়। তবুও দেখা যায় সবাই হাত-পা ছুড়ছে দুর্ঘটনার ময়নাতদন্তে।

রাজা ত্রিভুবন নারায়ণ বিমানবন্দর পাহাড়ে ঘেরা কাঠমান্ডু উপত্যকায়। এটি কাঠমান্ডু শহর থেকে প্রায় ছয় কিলোমিটার দূরে। উড়োজাহাজ বিধ্বস্ত তদন্তকারীদের মতে, ভৌগোলিক অবস্থান ছাড়াও নিচু দিয়ে ওড়া মেঘ, ঝুঁকিপূর্ণ রানওয়ে বিমান উড্ডয়ন বা অবতরণের ক্ষেত্রে মাঝেমধ্যেই বিপদের সৃষ্টি করে। যাত্রার শুরুর পর থেকেই অঘটনের শুরু হয় ত্রিভুবনে। গত ৩৬ বছরে ৭০টিরও বেশি দুর্ঘটনা ঘটেছে এ বিমানবন্দরে। এই তথ্য থেকে একটা প্রশ্ন উঠে আসে রাজা ত্রিভুবন নারায়ণ বিমানবন্দর কতটা নিরাপদ বিমান ওঠানামা পরিচালনায়, কতটা যোগ্য তারা?

আমরা তৃতীয় বিশ্বের লোকেরা তুরীয় বিমানানন্দ উপভোগ করি রিকন্ডিশন্ড বিমানে। কটা নতুন বিমান কেনা হয়! কতটা বিশ্রাম পায় এক একটি বিমান! ব্যক্তি মালিকাধীন বিমান চলাচল ব্যবসায় টিকেটের দাম যেমন প্রতিযোগিতার ঠেলায় রেলের চেয়েও কমে গেছে একইভাবে তারা থাকছে তুমুল দৌড়ের মধ্যে। এ ক্ষেত্রে সরকারি নজরদারি বড় দুর্বল। ৫ আগস্ট ১৯৮৪ তারিখে ঢাকায় খারাপ আবহাওয়ার মধ্যে অবতরণ করার সময় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ফকার এফ২৭-৬০০ জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের (এখন শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর) কাছাকাছি একটি জলাভ‚মির মধ্যে বিধ্বস্ত হয়। বিমানটি চট্টগ্রামের পতেঙ্গা বিমানবন্দর থেকে জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আসছিল। মোট ৪৯ জনের মৃতের সংখ্যাসহ এই দুর্ঘটনা ছিল বাংলাদেশের মাটিতে ঘটা প্রাণঘাতী বিমান দুর্ঘটনা এবং এয়ারলাইন্সের ‘সবচেয়ে খারাপ দুর্ঘটনা’র একটি। এই ভয়াবহ বিমান দুর্ঘটনার তদন্ত রিপোর্ট আজো প্রকাশ করা হয়নি। ২৮ মার্চ, ২০১৫ বাংলাদেশ বিমানের ০৮৫ নম্বরের ফ্লাইট এয়ারবাস-৩১০ সন্ধ্যাকাশে উড়ে চলছিল সিঙ্গাপুর থেকে ঢাকা। হঠাৎ চট্টগ্রাম শাহ আমানত বিমানবন্দর থেকে ৭০ নটিক্যাল মাইল দূরের আকাশে থাকা উড়োজাহাজের ভেতরের সব যাত্রী পাইলটের এক ঘোষণায় হতচকিত হয়ে পড়েন। যাত্রীরা এ সময় ভেতরে পোড়া গন্ধ পান। ক্রুরা ছোটাছুটি করতে থাকেন। যাত্রীরা এবার আতঙ্কিত। ৩০ বছরের পুরনো উড়োজাহাজটির ভেতরে তখন এক ভয়ানক পরিবেশ। ২০১৪ সালের জানুয়ারিতে আরেকটি এয়ারবাস-৩১০ এ ফাটল ধরে। ওই সময় এই এয়ারবাসটিতে বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা করছিলেন সংশ্লিষ্টরা। উড়োজাহাজটি ঢাকা-সিঙ্গাপুর রুটেই চলত। এর টয়লেট ভালো নয়। হ্যান্ড লাগেজ বাংকার নড়বড়ে। বারবার জোড়াতালি দিয়ে উড়োজাহাজটি ওড়ানো হচ্ছিল। বিমানটি শাহজালাল বিমানবন্দরে অবতরণ করে ধোঁয়া বেরোতে থাকা অবস্থায়। যাত্রীদের মধ্যে ছিলেন সাবেক রাষ্ট্রপতি ও জাতীয় পার্টি চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ, পানিসম্পদমন্ত্রী আনিসুল ইসলাম মাহমুদ এবং জাতীয় পার্টির মহাসচিব জিয়াউদ্দিন বাবলু। কথা ছিল তদন্ত হবে। যথা সময়ে রিপোর্ট বেরোবে। কই সে রিপোর্ট?

নিখুঁত কারিগরি সতর্কতা ও চূড়ান্ত দক্ষতার সঙ্গে বিমান চালালেও দুর্ঘটনা ঘটতেই পারে ও ঘটবে। কিন্তু তা নিয়ে তদন্তের ভনিতা, রিপোর্ট প্রকাশ না করা, অন্য দেশকে আগেই দায়ী করে বসা এবং সে দেশের বিমান উড্ডয়ন ও অবতরণ ব্যবস্থা নিয়ে আন্তর্জাতিক তদন্তের দাবি না করা পরিবহন নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে ঢিলে করে দেয়। দোষীর শাস্তি হয় না। আবার সব কিছু চলে গড্ডলিকা প্রবাহে। মানুষ সতর্ক হয় না। আবার একটা দুর্ঘটনা ঘটে। আমরা বলি এ তো ঘটবেই, এত ভয় যদি ঘরে বসে থাকো। তার পরে যতই বলি ‘আমার কাম্য নয় সেই মৃত্যু’দড়ির এক প্রান্তে কিন্তু শবদেহ দোলে।

কলকাতা থেকে
অমিত গোস্বামী : লেখক।