চামড়া শিল্প বিকাশে সরকারের পদক্ষেপ

আগের সংবাদ

বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ কেন আজ বিশ্ব স্বীকৃত

পরের সংবাদ

না, মানবিকভাবে বাংলাদেশ এগোয়নি

প্রকাশিত হয়েছে: নভেম্বর ১৭, ২০১৭ , ৮:৪২ অপরাহ্ণ | আপডেট: নভেম্বর ১৭, ২০১৭, ৮:৪২ অপরাহ্ণ

ফকির ইলিয়াস

কবি, লেখক

সেই টিটু রায়কে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে। কে এই টিটু রায়? কি তার পরিচয়? বাংলাদেশের রংপুর আবারো বিশ্বে সংবাদ শিরোনাম। বিদেশিরা আমাদের কাছে জানতে চাইছেন, বাংলাদেশে মানুষ পুড়িয়ে মারা হচ্ছে কেন? কেন ঘরবাড়িতে আগুন দেয়া হচ্ছে? কি তাদের অপরাধ? না- আমরা কোনো উত্তর দিতে পারছি না। উত্তর দেয়ার কোনো সুযোগ নেই। দেশে কি চরম অরাজকতা চলছে? একটি ধর্মীয় গোষ্ঠী বারবার আক্রান্ত হচ্ছেন কেন?

ফেসবুকে কথিত একটি স্ট্যাটাসকে কেন্দ্র করে ঠাকুরপাড়া গ্রামে হিন্দুদের বাড়িতে লুটপাট হয়েছে। এ সময় পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারায় এক ব্যক্তি। রংপুরে হিন্দুদের ওপর পরিকল্পিতভাবে হামলার অভিযোগ উঠেছে। বিক্ষোভকারীদের দেয়া আগুনে গ্রামের ৩০টি হিন্দু বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এলাকাবাসী জানিয়েছেন, যাকে নিয়ে এই হামলা সেই টিটু রায় থাকেন নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায়। চার বছর আগে কয়েকজনের কাছ থেকে টাকা ধার করে পালিয়ে গেছেন টিটু। টিটুর বাড়ি এই ঠাকুরপাড়া গ্রামে। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ইসলাম ধর্ম অবমাননা করে তিনি ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছেন। আসলে এই স্ট্যাটাস কেউ দেখেননি।

এদিকে, যার বিরুদ্ধে ফেসবুকে ‘ধর্ম অবমাননার’ অভিযোগ তুলে রংপুরে হিন্দুদের বাড়িঘরে আগুন দেয়া হয়েছে, সেই টিটু রায়কে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। টিটু রায়ের নামে মিথ্যা স্ট্যাটাস দিয়ে কারা এটা করেছে? ব্রাহ্মবাড়িয়ার নাসিরনগরের মতো রংপুরের হতদরিদ্র টিটু রায় ষড়যন্ত্রের শিকার, বলছেন অনেকেই। তার নাম ব্যবহার করে ফেসবুকে ভুয়া আইডি খুলে মহানবীকে নিয়ে নানা আপত্তিকর মন্তব্য করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে তার মা ভাইসহ স্বজন এবং এলাকাবাসী। খোদ রংপুরের পুলিশ সুপার মিজানুর রহমানও স্বীকার করেছেন টিটু রায় যে তার ফেসবুক থেকে স্ট্যাটাস দিয়েছে সেটা তারাও নিশ্চিত হতে পারেননি। বরং যে ফেসবুক আইডিতে এটা পাওয়া গেছে সেটা মো. টিটু নামে। ফলে এটা ফেক আইডি দিয়ে করা হয়েছে বলে গোয়েন্দারাও মনে করেন।

অনুসন্ধানে দেখা যাচ্ছে, যে আইডির কথা বলা হচ্ছে তাতে ‘এমডি টিটু’ বা মুহম্মদ টিটু নাম ব্যবহার করা হয়েছে। তাহলে অবশ্যই কেউ পরিকল্পিতভাবেই এটা করেছে তা না বুঝার কোনো কারণ নেই। আমরা দেখছি ফেসবুককে একটা ‘সামাজিক কাঁটা’ হিসেবে গড়ে তুলতে চাইছে কেউ কেউ। উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে কেউ কেউ এর অপব্যবহার করছে। গোটা বিশ্ব জুড়ে এ নিয়ে এখন কথা শুরু হয়েছে।

বিজনেস ইনসাইডার তাদের রিপোর্টে লিখেছে, ২০০৪ সালে ফেসবুকে বিনিয়োগ করেন শন পার্কার এবং ফেসবুক গড়ে তুলতে জাকারবার্গকে সহায়তা করেন। সে সময় তিনি ফেসবুকের প্রথম প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছিলেন। অবশ্য ২০০৫ সালেই তিনি ফেসবুক ছেড়ে দেন। ২০১০ সালে ফেসবুক তৈরির কাহিনী নিয়ে তৈরি ‘দ্য সোশ্যাল নেটওয়ার্ক’ চলচ্চিত্রটিতে শন পার্কারের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন জাস্টিন টিম্বারলেক। তবে এ চলচ্চিত্রটিতে শন পার্কারকে যে ভ‚মিকায় দেখানো হয়েছে তা পুরোপুরি কাল্পনিক বলেই জানিয়ে আসছেন শন।

এক্সিওসকে দেয়া সাক্ষাৎকারে পার্কার বলেন, এসব অ্যাপ্লিকেশন তৈরির প্রাথমিক চিন্তা ছিল মানুষের সময় ও মনোযোগ যতটা সম্ভব দখল করা। এর অর্থ হচ্ছে- সময় সময় সামান্য ডোপামিন দেয়ার মতো। কারণ, ছবি, পোস্ট বা কোনো কিছুতে কেউ লাইক বা মন্তব্য করার সুযোগ পায়। এর ফলে আরো বেশি কনটেন্ট বাড়ে এবং আরো বেশি লাইক, মন্তব্য বাড়তে থাকে। পার্কারের ভাষ্য, এটা সামাজিক বৈধ প্রতিক্রিয়ার একটা ফাঁস। মানুষের মনস্তাত্ত্বিক দুর্বলতাকে কাজে লাগানোর প্রক্রিয়া এটি। জাস্টিন রোজেনস্টিন নামের মার্কিন প্রকৌশলী ২০০৭ সালে ফেসবুকে কাজ করার সময় অসাধারণ ফিচার ‘লাইক’ তৈরি করেছিলেন। তিনিও এখন ফেসবুকের এ ফিচারটি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। রোজেনস্টিন মনে করছেন, বিশ্বজুড়ে মানুষের ওপর বিভিন্ন অ্যাপ্লিকেশন নানাভাবে মানসিক প্রভাব ফেলছে। এই ভয় তার মনে বাসা বেঁধেছে। তাই সতর্কতা হিসেবে রেডিট, স্ন্যাপচ্যাটের মতো অ্যাপ্লিকেশনগুলোর ব্যবহার থেকে নিজেকে সরিয়ে রেখেছেন ৩৪ বছর বয়সী এই প্রকৌশলী। রোজেনস্টিন তার উদ্ভাবিত ‘লাইক’ সম্পর্কে বলছেন, এটি নকল আনন্দের এক চকমকে ঘণ্টি। সিলিকন ভ্যালির সমালোচকরা লাইক বাটনকে অ্যাটেনশন ইকোনমি বা মনোযোগ কাড়ার অর্থনীতি বলে থাকেন।

সামাজিক এই হুমকি নিয়ে বিশ্বে উদ্বিগ্নতা বাড়ছে। সতর্ক করছেন মনোবিজ্ঞানীরাও। কলকাতার এক নামি হাসপাতালের সঙ্গে যুক্ত মানসিক চিকিৎসক ডা. শান্তনু গোস্বামী কিছুদিন আগে বলছেন, সাবধান হওয়া উচিত বাবা-মায়েদের। একটি মেয়ে বিদেশে চাকরি পাওয়ার কথা বলে বাড়ি চলে গেল কী করে, কেন বাবা-মা কোনোরকম খোঁজখবর নিলেন না মেয়ের থেকে- এই প্রশ্নগুলোই বেশি করে তুলে ধরছেন ডা. গোস্বামী। কলকাতা পুলিশের এক পদস্থ আধিকারিকও বলছেন, ছেলেমেয়ে হারিয়ে গেলে বা রাগ করে বাড়ি থেকে চলে গেলে অথবা কারো সঙ্গে পালালে, খুঁজে দেয়ার জন্য পুলিশের দ্বারস্থ হন বাবা-মায়েরা। কিন্তু অনেক সময়ই দেখা যায়, ছেলেমেয়েদের কোনো খবরই তারা রাখেন না। ছেলে বা মেয়ে কী করছে, কাদের সঙ্গে মিশছে, সে ফেসবুকের ভার্চুয়াল জগতেই হোক বা বাস্তব জীবনে, বাবা-মায়েরা জানেনই না। ফলে এক নিদারুণ বিচ্ছিন্নতা তৈরি হচ্ছে পারিবারিক, সামাজিক জীবনে।

সামাজিক মাধ্যমে ভুয়া আইডি বানিয়ে বিভিন্ন ধরনের অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে। সামাজিক মাধ্যমে ছবি বা ভিডিও ছড়িয়ে দিয়ে ধর্ষণ ও খুনের ঘটনাও নতুন নয় আজ আর। শুধু ফেসবুকই নয়, টুইটার, ইমো, হোয়াটস অ্যাপ, ভাইবার, গুগল প্লাস, ইনস্ট্রাগাম, স্কাইপিসহ বিভিন্ন যোগাযোগ মাধ্যমের সাহায্যে ব্ল্যাকমেইল করা হচ্ছে। এমনকি যোগাযোগ মাধ্যমে ধর্ষণ, খুন, অপহরণ এবং অর্থ আত্মসাতের ঘটনাও ঘটছে। কিন্তু কোনোভাবেই কার্যকরী ব্যবস্থা নিতে পারছেন না কর্তৃপক্ষ। দেশের বিপুল সংখ্যক মানুষ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সক্রিয়। ওই মাধ্যমকেই কাজে লাগাচ্ছে প্রতারকরা। পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজমের সাইবার ক্রাইম বিভাগে যোগাযোগ মাধ্যমে ব্ল্যাকমেইলের অনেক অভিযোগ যাচ্ছে। গ্রেপ্তার করা হয়েছে অনেককে। তবুও থামছে না অপরাধ। একের পর এক ঘটেই চলেছে এসব ঘটনা।

অতিসম্প্রতি রোহিঙ্গাদের ছবি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশে নতুন করে সহিংসতা এবং হাজার হাজার রোহিঙ্গার সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসছে। এমন অনেক ছবি সামাজিক মাধ্যমে দেখা যাচ্ছে, সেখানে অজগ্র বিভ্রান্তি-সৃষ্টিকারী ছবি বেরুতে শুরু করেছে।

বিবিসির সংবাদদাতা জোনাথন হেড লিখছেন, এসব ছবির বিষয়বস্তু অত্যন্ত নৃশংস এবং উসকানিমূলক এবং এগুলোর বেশির ভাগই ভুয়া। রাখাইন প্রদেশের বৌদ্ধদের সঙ্গে সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা মুসলিমদের সংঘাত বহুবার মারাত্মক দাঙ্গার চেহারা নিয়েছে। কিন্তু এসব এলাকায় সাংবাদিকদের প্রবেশাধিকার অত্যন্ত সীমিত আর ঘটনা সম্পর্কে তথ্যও পাওয়া যায় খুবই কম। যারা সেখানে যেতে পেরেছেন, তারাও দেখেছেন যে পরিস্থিতি এবং দুই সম্প্রদায়ের বৈরিতার কারণে তথ্য সংগ্রহ করাও খুব কঠিন।

এমন কিছু ছবির বিবরণও এসেছে মিডিয়ায়। একটি ছবিতে অনেকগুলো ফুলে-ওঠা মৃতদেহ দেখা যায়। বেশ কিছু বার্মিজ বলেন, এগুলো ২০০৮ সালে সাইক্লোন নার্গিসে নিহতদের ছবি। অন্য অনেকে বলেন, এটা এক নৌকাডুবিতে নিহতদের ছবি। তবে ওই ঘটনাগুলোর এমন কোনো ছবি পাওয়া যায়নি- যা হুবহু এ রকম। তবে এ ছবিগুলো কিছু ওয়েবসাইটে বেরিয়েছিল, কিন্তু তা গত বছর। এর মানে, ছবিগুলো রাখাইন রাজ্যে গত কয়েকদিনের সহিংসতার ছবি নয়। আরেকটি ছবিতে গাছের সঙ্গে বাঁধা একজন মৃত পুরুষের জন্য বিলাপরত এক নারীর। বিবিসি নিশ্চিত করেছে যে এটি ২০০৩ সালের জুন মাসে ইন্দোনেশিয়ার আচেহ প্রদেশে তোলা আর তা তুলেছেন রয়টারের একজন ফটোগ্রাফার।

অন্য একটি ছবি, মায়ের মৃতদেহ নিয়ে ক্রন্দনরত দুটি শিশুর। এটি তোলা হয়েছে রোয়োন্ডায় ১৯৯৪ সালের জুলাইয়ে। ওয়ার্ল্ড প্রেস এওয়ার্ড পুরস্কারপ্রাপ্ত একটি সিরিজের অংশ এই ছবিটি তুলেছিলেন সিপার আলবার্ট ফাসেলি। দৃশ্যে দেখা যাচ্ছে- একটি নালায় ডুবে থাকা কিছু লোকের ছবি। এ ছবিটির উৎস বের করা কঠিন ছিল। কিন্তু নেপালের সাম্প্রতিক বন্যার জন্য সাহায্য সংগ্রহকারী একটি ওয়েবসাইটে এই ছবিটি আছে। কী আশ্চর্য আজকের প্রচার মাধ্যম! কারা এসব করছে? কেন করছে?

বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়া হচ্ছে। খুব ভালো কাজ। কিন্তু পাশাপাশি হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়ি দখল, আগুন, ধর্ষণ কেন করা হচ্ছে? এরা তো এ দেশেরই জন্ম সূত্রের নাগরিক। কি হচ্ছে বাংলাদেশে? না, বাংলাদেশ মানবিকভাবে এগোয়নি। মানুষের মাঝে মানবতা লোপ পাচ্ছে। এভাবে একটি রাষ্ট্র এগোতে পারে না। একটি প্রজন্ম নির্ভয়ে দাঁড়াতে পারে না। খুবই লজ্জার বিষয়, যারা আক্রান্ত- তারাই আবার আইনি মারপ্যাঁচের শিকার হচ্ছেন। আমাদের ১৯৭১-এর বাংলাদেশকে ফিরে দেখতে হবে। সেই ঐক্য চাই। সেই দৃঢ়তা চাই। মানুষের পাশে মানুষ দাঁড়ালেই হায়েনারা পালিয়ে যাবে। পালিয়ে যেতে বাধ্য হবে।