বার্সেলোনার সাফল্যের সূত্র

আগের সংবাদ

বিসিবির নির্বাচন আজ

পরের সংবাদ

মানহীন ছবির জঞ্জাল বাড়ছে

প্রকাশিত হয়েছে: অক্টোবর ৩১, ২০১৭ , ১২:৪৭ অপরাহ্ণ | আপডেট: অক্টোবর ৩১, ২০১৭, ২:০৮ অপরাহ্ণ

গত কয়েক বছরে এই মানহীন ছবির আধিক্যে ভালো ছবি খুঁজে পাওয়া দুষ্কর হয়ে পড়েছে। প্রতি বছর শেষে দেখা যাচ্ছে, সংখ্যাতত্ত্বে ।
মানহীন ছবিগুলোই রাজত্ব করছে। এসব ছবির ভিড়ে ভালো ছবিও দর্শকদের সমাদর পাচ্ছে না

ঢাকাই সিনেমার অবস্থা করুণ। প্রযোজকরা পুঁজি খাটিয়ে লাভের মুখ দেখতে পারছেন না। বিনিয়োগকৃত পুঁজি ফিরিয়ে আনতে ব্যর্থ হচ্ছে বছরের মুক্তিপ্রাপ্ত সিংহভাগ ছবি। সিনেমা হলে দিন দিন দর্শকসংখ্যা হ্রাস পাচ্ছে। সিনেমা হল বন্ধ হওয়ার ধারাবাহিকতায় পড়ছে না ছেদ। গত বছর কাওরানবাজারের পূর্ণিমা হল বন্ধ হওয়ার ঘটনা ছিল সবচেয়ে হৃদয়বিদারক। কিন্তু কিছুতেই ব্যবসা চাঙ্গা করা যাচ্ছে না। স্যাটেলাইটের প্রভাবে সিনেমা হলে দর্শক কমে যাওয়ার ঘটনা নতুন নয়। দর্শকসংখ্যার কমে যাওয়ার কারণে সিনেমা হলের আয় কমে গেছে। ধুঁকতে ধুঁকতে অনেক সিনেমা হল এক পর্যায়ে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। সিনেমা সংশ্লিষ্টরা ছবির ব্যবসা মন্দা হওয়ার কারণ অনুসন্ধানে দিবারাত্রি একাকার করে ফেলছেন। মন্দা ব্যবসায়ের বড় কারণ বলে সংশ্লিষ্টরা চিহ্নিত করছেন মানহীন ছবির নির্মাণ বেড়ে যাওয়াকে।

ইদানীং ছবি নির্মাণ আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। তার ওপর যে ছবিগুলো হচ্ছে তার অধিকাংশই মানহীন বলে দর্শকরা প্রত্যাখ্যান করছেন। একের পর এক মানহীন ছবি দেখে দেখে ত্যক্ত-বিরক্ত দর্শকরা সিনেমা হলের প্রতি মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। মানহীন ছবির নির্মাণ সবসময়ই ছিল ঢাকাই সিনেমায়। কিন্তু গড়পড়তা হিসাব করলে মানহীন ছবির সংখ্যা হতো কম। আর এখন মানহীন ছবিরই দাপট। গত কয়েক বছরে এই মানহীন ছবির আধিক্যে ভালো ছবি খুঁজে পাওয়া দুষ্কর হয়ে পড়েছে। প্রতি বছর শেষে দেখা যাচ্ছে, সংখ্যাতত্ত্বে মানহীন ছবিগুলোই রাজত্ব করছে। এসব ছবির ভিড়ে ভালো ছবিও দর্শকদের সমাদর পাচ্ছে না। সিনেমা হলের প্রতিই আসক্তি হারিয়ে ফেলছেন দর্শকরা।

মানহীন যে ছবিগুলোর কথা বলা হচ্ছে এগুলো খুব স্বল্প বাজেটে তৈরি হয়। ডিজিটাল প্রদর্শন ব্যবস্থা চালু হওয়ার পর মূলত এসব ছবির নির্মাণ বেড়ে গেছে। কম খরচে ছবি নির্মাণ করে মুক্তি দেয়ার সুযোগ কাজে লগিয়ে কিছু প্রযোজক সিনেমা ব্যবসায় নামছেন। নামসর্বস্ব শিল্পীদের নিয়ে দায়সারাভাবে এসব ছবি নির্মাণ করা হয়। ছবিগুলোর শুটিং-ডাবিং শেষ করতেও বেগ পেতে হয়। রিলিজ দিতে গিয়েও ছবিগুলোর প্রযোজকরা হিমশিম খান। কোনোমতে রিলিজ দিলেও শুক্রবার থেকেই দর্শকশূন্য হতে থাকে সিনেমা হল।

পোস্টার দেখেই দর্শকদের ছবি দেখার আগ্রহ মরে যায়। নামগোত্রহীন শিল্পীদের ছবি দিয়ে ভর্তি কদর্য ডিজাইনের পোস্টার টানতে পারে না দর্শকদের চোখ। ছবির ট্রেলারগুলোও হয় বাজে। আধুনিকতার ছিটেফোঁটা থাকে না। স্যাটেলাইটে ছবি দেখে অভ্যস্ত দর্শকরা খোঁজে চকচকে ছবি। কিন্তু সিনেমা হলে গিয়ে তারা হতাশ হন। অধিকাংশ দর্শকরা অবশ্য সিনেমা হলে যাওয়ার আগেই ছবি না দেখার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন পোস্টার-ফটোসেট-বিলবোর্ড দেখে।

মানহীন ছবিগুলো রিলিজ পর্যন্ত কষ্টেসৃষ্টে এলেও সেন্সর বোর্ডের আঙিনা মাড়াতেও এসব ছবিকে বেগ পেতে হয়। সেন্সর বোর্ডেই ছবিগুলো সমালোচনার মুখে পড়ে। বোর্ড সদস্যরা নিতান্ত দায়ে পড়ে ছবিগুলোর সার্টিফিকেট ইস্যু করেন। আর এই সেন্সর সার্টিফিকেটের জোরেই ছবিগুলোর প্রযোজকরা সিনেমা হলের ছবি মুক্তির সুযোগ পান।
কিন্তু ‘ছবি’ বলা হলেও আদতে এগুলো সস্তা গল্পের সস্তা নির্মাণ ছাড়া কিছুই নয়। এগুলোর এডিটিং, সিনেমাটোগ্রাফি হয় মান্ধাতার আমলের। সেট ডিজাইন, প্রডাকশন ডিজাইন বলে কিছু থাকে না। চিত্রনাট্য বলে কিছু খোঁজার চেষ্টা তামাশা। অভিনয়ের ধার ধারে না পাত্র-পাত্রীরা। এগুলোর দুয়েকটা হজম করা গেলেও বেশির ভাগ ছবি জঘন্য নির্মাণের কারণে পুরো দেখাও সম্ভব নয় রুচিশীল দর্শকদের পক্ষে। এই শ্রেণির দর্শকরা দিন দিন সিনেমা হল পরিত্যাগ করছে কদর্য ছবিগুলোর কারণে।

ঢাকাই সিনেমার ইমেজের জন্যও ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়িয়েছে মানহীন ছবির নির্মাণ বেড়ে যাওয়া। এসব ছবিতে নামি দুয়েকজন নায়ক-নায়িকা থাকায় তারাও তোপের মুখে পড়ছেন। কিছুদিন আগে মঈন বিশ্বাস পরিচালিত ‘মার ছক্কা’ নামে একটি ছবিতে অভিনয় করে
ফেসবুকে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েন ওমর সানী। এই ছবির নকল পোস্টার, বিচিত্র ট্রেলার ফেসবুকে হাস্যরসের তুফান তোলে। প্রায় ৪০টি সিনেমা হলে মুক্তি পেয়েও তাক লাগিয়ে দেয় ছবিটি। যথারীতি সিনেমা হলে দর্শকরা ছবিটিকে প্রত্যাখ্যানই করেন।
‘মার ছক্কা’র মতো আরো কিছু ছবির মধ্যে রয়েছে ‘মনের অজান্তে’, ‘চিনিবিবি’, ‘যদি তুমি জানতে’, ‘ষোল আনা প্রেম’, ‘অজান্তে ভালোবাসা’, ‘আড়াল’ ইত্যাদি। ছবিগুলো মানহীনতার দোষে দুষ্ট। ‘মা বাবা সন্তান’, ‘হৃদয় দোলানো প্রেম’, ‘কুমারি মা’ ইত্যাদি ছবিগুলো প্রদর্শনের প্রায় অনুপযোগী। কিন্তু সেন্সর বোর্ডে দেনদরবার করে ছবিগুলো মুক্তি পায়। বুকিং এজেন্টদের সংঘবদ্ধতার সুযোগে সিনেমা হলও পেয়ে যায়।

ছবিগুলো মন্দা সিনেমার ব্যবসায় কিছু যোগ করতে পারে না। বরং সিনেমার রুগ্ণ দশাকেই আরো বেশি ফুটিয়ে তোলে। ডজন ডজন ছবি মিলেও একটি হিট ছবির সমপরিমাণ ব্যবসা করতে পারে না। পড়তি পরিচালকরা কিংবা মেধাহীন পরিচালকরা মানহীন ছবিগুলো পরিচালনা করেন। পরিচালনার অভিজ্ঞতার অভাবে ন্যূনতম মান রক্ষা করতে ব্যর্থ হয় এসব ছবি। ছবিগুলো প্রযোজনা করেন আনাড়ি প্রযোজকরা। যাদের সিনেমার মান কিংবা সিনেমার দর্শক ধরার কোনো দক্ষতা নেই। ফলে এসব ছবি রিলিজের পর জঞ্জাল বলেই নিক্ষিপ্ত হয়। এসব ছবির টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতেও কোনো চাহিদা থাকে না। চাহিদা থাকে না ইউটিউবে কিংবা ডিভিডি প্রকাশনায়। কোনো খাত থেকেই ভুঁইফোড় প্র্রযোজক টাকা পান না। উল্টো তারা হারিয়ে ফেলেন সিনেমার প্রতি আগ্রহ। এসব ছবির প্রযোজককে সচরাচর দ্বিতীয়বার প্রযোজনায় নাম লেখাতে দেখা যায় না।

কদাচিৎ প্রযোজক নিজেও অভিনয় করে ছবির চ‚ড়ান্ত সর্বনাশ নিশ্চিত করেন। সবমিলিয়ে এসব মানহীন ছবি তৈরি হয় এবং মুক্তি পেয়ে হারিয়ে যায় চিরতরে। আর ক্রমাবনতিশীল সিনেমা শিল্পের ধ্বংসকেই ত্বরান্বিত করে। সিনেমা সংশ্লিষ্টরা এসব মানহীন ছবি নির্মাণের ঘোর বিরোধী। যেসব ছবি দেখে দর্শকরা তৃপ্তি পায় না, প্রযোজেকর পুঁজি হারিয়ে যায় আর সিনেমার ইমেজের মারাত্মক ক্ষতি হয়।

  • আরও পড়ুন
  • লেখকের অন্যান্য লেখা