বিশ্ব সম্প্রদায়ের আরো জোরালো ভূমিকা চাই

আগের সংবাদ

ইন্দোনেশিয়ায় ৬.৭ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প

পরের সংবাদ

খালেদার আগমন ও সুষমার সাক্ষাৎ

প্রকাশিত হয়েছে: অক্টোবর ২৪, ২০১৭ , ৯:৪৪ অপরাহ্ণ | আপডেট: অক্টোবর ২৪, ২০১৭, ৯:৪৫ অপরাহ্ণ

শেখর দত্ত

রাজনীতিক, কলাম লেখক

১৪ অক্টোবর শনিবার লন্ডন থেকে খালেদা জিয়ার একান্ত সচিব ঢাকায় টেলিফোন করে জানালেন, বিএনপি-জামায়াতের ২০ দলীয় জোট নেত্রী খালেদা জিয়া ১৮ অক্টোবর দেশে আসছেন। এর আগে বিএনপি সূত্র থেকে জানা গিয়েছিল, অসুস্থতার কারণে তিনি আরো কিছুদিন লন্ডনে অবস্থান করবেন। লন্ডনে পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে বৈঠক করেছেন, এমন খবর ঢাকার কোনো কোনো সংবাদপত্রে প্রকাশ পেলেও তা তিনি করেছেন গোপনে। এমনিতে তিনি ছিলেন নীরবে-নিভৃতে। লন্ডন বিমানবন্দরে তাই তিনি বলেছেন, ‘আমি আপনাদের সঙ্গে মিটিং করতে পারিনি। আপ্যায়ন করতে চেয়েছেন, আমি অংশ নিতে পারিনি। আমি এসেছিলাম চিকিৎসার জন্য। মঙ্গলবারও ডাক্তারের কাছে গিয়েছিলাম।’

দেশের দ্বিতীয় বড় দল, যে দলের যুক্তরাজ্যে অবস্থানরত বাঙালিদের মধ্যে রয়েছে বেশ ভালো সমর্থন এবং লন্ডনে মিটিং করলে ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে নেতাকর্মীরা চলে আসবে, সেই দলের প্রধান নেতার মিটিং বা কারো সঙ্গে দেখা না করে চলে আসাটা বিরল ও অভিনব ঘটনা বৈকি! আরো আগ্রহ উদ্দীপক হচ্ছে এই যে, দলের দ্বিতীয় প্রধান নেতা তারেক রহমানও আছেন লন্ডনে। এক সময় তিনি অনবরত মিটিং করে ইতিহাস বিকৃতকারী আবোলতাবোল নানা কথা কথা বলেছেন। কিন্তু মা ও প্রধান নেত্রী থাকাকালীন তিনিও ছিলেন একেবারে নিশ্চুপ। মায়ের স্বাস্থ্য সম্পর্কেও মুখ খোলেননি। সাধারণভাবে যা হয়, অপারেশনের সময় মঙ্গল কামনায় দোয়া-দরুদ পড়ার জন্যও আহ্বান জানানো হয়নি। নীরবতা ও বিচ্ছিন্নতার মধ্যে কেমন যেন একটা রহস্যময় পরিবেশ সৃষ্টিতে প্রয়াসী ছিলেন। এমনটা কোনো একটা বড় রাজনৈতিক দলের জন্য ব্যতিক্রমী ঘটনা বৈকি! প্রকৃতপক্ষে উল্লিখিত বিবরণ থেকে দুটো বিষয় স্পষ্ট। এক. হঠাৎ করেই খালেদা জিয়া দেশে আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। দুই. বিশেষ কোনো কারণ না থাকলে এভাবে কোনো বড় রাজনৈতিক দলের এক ও দুই নম্বর নেতা নিশ্চুপ থাকতে পারেন না।

গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি এবং গ্রেপ্তার বিষয়ে সরকারের নরম হওয়াসহ ঘটনা পর্যবেক্ষণে যতটুকু ধারণা করা যায় তাতে মনে হয়, দুই পক্ষ তথা ক্ষমতাসীন মহল আর সেই সঙ্গে বিএনপির থিংকট্যাংক চেয়েছে খালেদা জিয়া দেশে আসুন এবং সুষমার সঙ্গে সাক্ষাৎ-আলোচনা হোক। লন্ডনে বিজেপির সঙ্গে সাক্ষাতের প্রকাশিত সংবাদটাও এক্ষেত্রে বিবেচনায় নেয়া যেতে পারে। সাক্ষাতের জন্য অতি আগ্রহ বা
সাক্ষাতের পরপর অতি উল্লাস ভাব দেখানোটাই এর প্রমাণ।

স্বভাবতই তাই দুটো প্রশ্ন! কী এমন ঘটনা ঘটেছে বা অবস্থা সৃষ্টি হয়েছিল! যাতে এভাবে হঠাৎ করেই দলীয় প্রধান নেতাকে চলে আসতে হলো? আর দুজনেই এমন নিশ্চুপ হয়ে রয়েছিলেন কেন? এই দুই প্রশ্নে পর্যবেক্ষণ-আলোচনায় প্রথমেই বলতে হয় যে, খালেদা জিয়া দুইবার দেশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন এবং আইনজীবী পরামর্শক দলের খুব একটা যে কম আছে তা নয়। তাই ভালো করেই তিনি ও তার থিংকট্যাংকদের জানার মধ্যে ছিল যে, মামলার তারিখে তিনি যদি হাজিরা না দিতে থাকেন তবে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হবে। তেমনটাই হয়েছিল। অক্টোবরের দ্বিতীয় সপ্তাহে মামলায় হাজিরা না দেয়ার কারণে খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে আদালত গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে।

সহজেই ধারণা করা যায়, লন্ডনে দলের প্রধান দুই নেতাসহ বিএনপির থিংকট্যাংক আশা করে বসেছিলেন যে, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়বে। জামায়াতকে দিয়ে হরতাল ডাকানোর ভেতর দিয়ে সেই চেষ্টাও করা হয়েছিল। দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম দলের প্রধান নেতার গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জরির পর এমন ধরনের আশা করা তাদের জন্য অস্বাভাবিক ছিল না। কিন্তু কিছুই হয়নি। গুড়ে বালি প্রবাদটা এ ক্ষেত্রে হয়েছে সত্য। একটু খেয়াল করলেই দেখা যাবে, এমনটা ২০০৮ সালে ক্ষমতা ছাড়ার পর থেকেই হয়ে আসছে। আর্মি ও নিরপেক্ষ-সুশীল ব্যাকড জরুরি আইনের ফখরুদ্দিন-মঈনউদ্দিনের তত্ত্বাবধায়ক সরকার খালেদা জিয়া বা তারেক জিয়াকে যখন গ্রেপ্তার করে এবং দ্বিতীয় জনকে নির্বাসনে পাঠিয়ে দেয়, তখনো কিন্তু বিএনপি-জামায়াতের জোট কোনো আন্দোলন সংঘটিত করতে পারেনি। ভাগ্যি দল ও ২০ দলীয় জোটের! আওয়ামী লীগের আন্দোলনের ফলে তখন রক্ষা পেয়ে যায়! তারপর নির্বাচনে পরাজয় হওয়ার পর ২০১০ সালে যখন জিয়া পরিবার ক্যান্টনমেন্টের অবৈধ দখলকৃত বাড়ি থেকে আদালতের রায়ে উচ্ছেদ হন, তখনো দল-জোট আন্দোলন করতে ব্যর্থ হয়। বাড়ির শোকে আর নেতাদের ব্যর্থতায় খালেদা জিয়া তখন ক্রন্দন ও ক্ষোভ দমন করতে না পেরে বলেছিলেন নেতারা সব ‘আঙ্গুল চোষা’। তারপর থেকে এখন গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি পর্যন্ত নেতারা আসলেই ‘শিশু’ থেকে গেলেন, বড় হতে পারলেন না।

এবারেও আন্দোলন দূরে থাক, দল যখন একটুও নড়ল না, তখন প্রধান নেতা খালেদা জিয়ার দেশে না এসে উপায় কী? প্রসঙ্গত বলতেই হয় দেশে ফেরার আগে এমন ভাবাটাই সঙ্গত ছিল যে, দেশে ফেরার সঙ্গে সঙ্গে তিনি গ্রেপ্তার হতে পারেন। আর গ্রেপ্তার হলে ইপ্সিত আন্দোলন হবে এমনটাও মনে করাই ছিল সঙ্গত। আর বিএনপি তো নির্বাচন সামনে রেখে আন্দোলন চাইবেই। কেননা অস্থিরতা অরাজকতা অস্থিতিশীলতা অর্থাৎ ‘তিন অ’ যে দলটির এখন একান্ত প্রয়োজন। কিন্তু অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় খালেদা জিয়া রিস্ক নিয়ে সেই পথে গিয়ে দলকে চাঙ্গা করতে চাননি। বিমানবন্দরে কর্মীদের উদ্দেশে সংক্ষিপ্ত কথায় খালেদা জিয়া বলেন যে, ‘দলের ঐক্য বড় বিষয়। দলের মধ্যে মতবিরোধ থাকতেই পারে। মুরুব্বিদের সম্মান দিতে হবে। তবে তরুণদের প্রাধান্য দিতে হবে। দলে অবশ্যই সিনিয়রদের প্রয়োজন আছে।’ তিনি প্রবাসীদের ভোটার হওয়ার এবং তারেক দেখে রাখার আহ্বান জানিয়েছেন। এখানে বিবেচ্য বিষয় হলো এই যে, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা থাকা সত্তে¡ও খালেদা জিয়া একটিবারের জন্যও গ্রেপ্তার হওয়া বিষয়টা বললেন না কেন? তাতে কি দল চাঙ্গা হতো না? রিক্সটা ছিল এবং বলাটাই তো ছিল সঙ্গত।

এ বিষয়ে কিছুই না বলার ভেতর দিয়ে এটা সুস্পষ্ট যে, খালেদা জিয়া নিশ্চিত ছিলেন তাকে গ্রেপ্তার করা হবে না। আরো স্পষ্ট এ কারণে যে, বিএনপির ‘আঙ্গুল চোষা’ নেতারা ঘর থেকে বের হতে চান না বলে দল জমায়েতও করে না। কিন্তু নেত্রীর আগমনে তারা ঘর থেকে বের হয়েছে। আরো লক্ষণীয় যে, সরকারের তরফ থেকেও গ্রেপ্তার বিষয়ে গরম থেকে নরম হওয়ার বিষয়টা কথাবার্তার দিক থেকে প্রত্যক্ষ করা গেছে। অবস্থা পর্যবেক্ষণে তাই এটা বলাই যায়, কোনো না কোনোভাবে সরকারের সঙ্গে গ্রেপ্তার ও জমায়েত বিষয়ে বোঝাপড়া করেই তিনি দেশে ফিরেছেন। রাজনৈতিক অঙ্গনে এই বোঝাপড়া নিয়ে গুজবও রয়েছে। যদি এটা বিন্দুমাত্র সত্য হয় তবে বলতেই হবে, দলের প্রধান নেতা গ্রেপ্তার হওয়ার রিস্ক নেননি। আর দ্বিতীয় নেতা তারেক রহমান তো মামলা ও গ্রেপ্তার হওয়ার ভয়ে পালিয়েই আছেন।

সমঝোতা না করে নেতা গ্রেপ্তার হয়ে দলকে চাঙ্গা বা আন্দোলনে নামানোর বহু উদাহরণ দেশের রাজনীতিতে রয়েছে। তাই বলতেই হয়, গ্রেপ্তার বরণ করে দলকে চাঙ্গা করার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করেন যে দলের প্রধান দুই নেতা, সেই দলে নেতা-কর্মীরা ‘আঙ্গুল চোষা’ হবে না তো কারা হবে? প্রকৃত বিচারে বিএনপি এটা প্রমাণ করে চলেছে যে, দলটি ক্ষমতায় গেলে ভয়ানক দৈত্য আর ক্ষমতা থেকে বাইরে থাকলে শিশু। ক্ষমতায় থাকতে ‘হাওয়া ভবন’ ও প্রধানমন্ত্রীর অফিস দুয়ে মিলে এক হয়ে লুটপাট ও হত্যা-খুন করে প্রলয়কাণ্ড ঘটায় আর বিরোধী দলে এলে হয় নিতান্তই পঞ্চকবির এক কবি ডি এল রায়ের কবিতার নায়কের মতো ‘নন্দলাল’ হয়ে যায়। দেশ উদ্ধারের জন্য লম্বা লম্বা কথা ছাড়া আর কিছুই করতে পারে না।

শুধু কি তাই! রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ কী বলে! খালেদা জিয়া বিদেশে যাওয়ার পর দেশে ‘তিন অ’ সৃষ্টি হওয়ার মতো কতক ঘটনা ঘটেছে। প্রথমত প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহাকে নিয়ে উদ্ভ‚ত পরিস্থিতি। তিনি কেন ষোড়শ সংশোধনীর বিষয়ে রায় দিতে গিয়ে পর্যবেক্ষণে অপ্রয়োজনীয়ভাবে রাজনৈতিক প্রসঙ্গ টেনে আনলেন আর পরে পাকিস্তান প্রসঙ্গ বললেন! কেনই বা ট্র্যাডিশন ভঙ্গ করে রাজনৈতিক বক্তব্য দিতে থাকলেন, তা রহস্যময় বৈকি! আরো একটি বিষয় লক্ষণীয় যে, গণফোরাম নেতা কামাল হোসেন প্রমুখরা এ ব্যাপারে যার পর নাই সরব হয়ে হঠাৎই বা কোথায় গেলেন! এখনই তো তাদের সরব হওয়ার সুবর্ণ সুযোগ (!) ছিল! সর্বোপরি সরকারই বা সিনহার ব্যাপারে এতটা স্পর্শকাতর হয়ে উঠল কেন? তৎপরতায় এতটা অস্থিরতা ও অসাবধানতা প্রকাশ করল কেন? তাহলে কি ‘বিচার বিভাগীয় ক্যু’ কথাটা সত্য! দ্বিতীয়ত কোনো অনুমান ছাড়া হঠাৎই কেন বেড়ে যেতে থাকল অযৌক্তিকভাবে অনবরত চালের দাম? দাম কিছু কমে স্থিতিশীল হওয়ায় ধারণা করা যায় এর পেছনেও কিছু থাকতে পারে। তৃতীয়ত, কোনো কিছু আঁচ করার আগেই কেন রোহিঙ্গাদের -শ্রোত বাংলাদেশে আসতে থাকল? ‘আরসা’ বা চিনের সমর্থনপুষ্ট মিয়ানমারের সেনাবাহিনী এমন সময়টা কি বেছে নিয়েছে?

কেবল তাই নয়! প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার প্রচেষ্টার খবরটা তখন ভারতীয় সাংবাদিকদের দিয়ে মিয়ানমারের অখ্যাত এক পোর্টালে প্রকাশ হলো কেন! কেন প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে সরকারের মধ্যে সত্য-মিথ্যা নিয়ে কথার অসঙ্গতি ও অস্থিরতা প্রকাশিত হলো? এসব দিক পর্যবেক্ষণে নিয়ে কেউ যদি ইত্তেফাকে প্রকাশিত খালেদা জিয়া ও পাকিস্তানি ইন্টিলিজেন্সের বৈঠক হওয়ার খবরটা মেলায়, তবে পর্যবেক্ষণের ফল কী দাঁড়ায়! এই সময়ে তারেক রহমান আর ভারতের ডন ইব্রাহিমের যোগাযোগ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নানা কথা উঠেছে। ঘর পোড়া গরু সিঁদুরে মেঘ দেখলে ভয় পায়। আর ষড়যন্ত্র-চক্রান্ত জন্মলগ্ন থেকেই বিএনপির বড় এক অস্ত্র। অভিজ্ঞতা থেকে এটা প্রমাণিত দলটির নেতারা যখন নীরব থাকেন, তখন ষড়যন্ত্র-চক্রান্ত চলে। এসবের সামান্য কিছুও যদি সত্য হয় তবে এই সময়টায় খালেদা জিয়া ও তারেক জিয়ার নীরবে-নিভৃতে থাকা দিয়ে অনেক কিছুই অনুমান করা যায়। পর্যবেক্ষণে মনে হয় খালেদা জিয়া ও তারেক জিয়া নীরবে-নিভৃতে লন্ডনে থাকাটা যড়যন্ত্র-চক্রান্তেরই অংশ। তবে আরো একটা কারণ যে ছিল তা খালেদা জিয়ার বিমানবন্দরের উল্লিখিত বক্তব্য থেকে সুস্পষ্ট।

সব কথার চাইতে বেশি গুরুত্ব দিয়ে তিনি দলের ঐক্য এবং দলে প্রবীণ নবীন ভারসাম্য সম্পর্কে বলেছেন। এটা তো ঠিক যে, নবীনদের প্রকৃত নেতা হচ্ছেন তারেক জিয়া আর প্রবীণরা খালেদা জিয়া আশ্রয়স্থল। তাই ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণে বলা যায়, বয়স হয়েছে তাই চিকিৎসা করালেও মূলে রথ দেখা ও কলা বেচা অর্থাৎ রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক দুই কারণ ছিল খালেদা জিয়ার লন্ডন গিয়ে তিন মাস বসে থাকার। ষড়যন্ত্র-চক্রান্ত কার্যকর করা অথবা গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির ভেতর দিয়ে তথাকথিত আন্দোলন দিয়ে ‘তিন অ’-এর দিকে দেশকে ঠেলে দেয়া আর সেই সঙ্গে দলকে ঐক্যবদ্ধ করার জন্য খালেদা জিয়া এই সময়টুকু ব্যয় করেছেন।

রাজনীতির ক্ষেত্রে সাফল্য আসেনি। তবে সাংগঠনিক ক্ষেত্রে সাফল্য নিয়ে তিনি লন্ডন ছাড়তে পেরেছেন কি না, তা এখনই বলা শক্ত। এই প্রশ্নের উত্তর তাই আগামী দিনের জন্যই তুলে রাখতে হবে। তবে বিমানবন্দরের জমায়েতে তারেক জিয়া নীরব থাকায় আর তারেক জিয়ার ‘পাশে থাকার’ আহ্বান খালেদা জিয়া জানানোর ফলে মনে হচ্ছে, বিরোধটা এখনও মিটে নাই। তবুও তিনি তাড়াহুড়া করে চলে এসেছেন। কারণটা যে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও ক্ষমতাসীন দলের গুরুত্বপূর্ণ নেতা সুষমা স্বরাজের সঙ্গে সাক্ষাৎ করা, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি এবং গ্রেপ্তার বিষয়ে সরকারের নরম হওয়াসহ ঘটনা পর্যবেক্ষণে যতটুকু ধারণা করা যায় তাতে মনে হয়, দুই পক্ষ তথা ক্ষমতাসীন মহল আর সেই সঙ্গে বিএনপির থিংকট্যাংক চেয়েছে খালেদা জিয়া দেশে আসুন এবং সুষমার সঙ্গে সাক্ষাৎ-আলোচনা হোক। লন্ডনে বিজেপির সঙ্গে সাক্ষাতের প্রকাশিত সংবাদটাও এক্ষেত্রে বিবেচনায় নেয়া যেতে পারে।

সাক্ষাতের জন্য অতি আগ্রহ বা সাক্ষাতের পর পর অতি উল্লাস ভাব দেখানোটাই এর প্রমাণ। জামিন চাইতে গিয়ে খালেদা জিয়ার মুখ ফসকে একটা কথা বের হয়ে এসেছে, ‘কার কাছে যাব!’ আসলে সুষমা স্বরাজের কাছে ধরনা ভিন্ন আর অন্য কোনো উপায় ছিল না খালেদার!

‘উপায় নেই গোলাম হোসেন’ পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ার কারণেই অনবরত বিএনপিকে ডিগবাজি দিতে হচ্ছে। ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি মিলনায়নের গত সোমবার মহাসচিব ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলে দিয়েছেন, ‘আমরা কারো কাছে দয়া ভিক্ষা করি না। আমরা এ কথা বিশ্বাস করি না, কেউ এসে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করে দিবে।’ বলাই বাহুল্য, কেবল এন্টি-ভারত মুখোশটা নেতাকর্মী ও জনগণের কাছে রাখার জন্যই নয়, পরাজিত বিদেশি মুরব্বিদের বুঝ দেয়াও যে এর উদ্দেশ্য তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
সব শেষে এটা বলতে হয় যে, বিএনপির নির্বাচনে যাওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। যদি দলটি নির্বাচনে অংশ না নেয়, তবে বিধি অনুযায়ী দলের নিবন্ধন বাতিল হয়ে যাবে।

এমনিতে এখন খালেদা জিয়া গাড়ি বাড়ির জাতীয় পতাকা ও সুযোগ-সুবিধা হারিয়েছেন। তাই ভেতরে ভেতরে ‘তিন অ’-এর নীলনকশা কার্যকর করতে চাইলেও বাধ্য হয়ে বিএনপি এখন নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকার বিষয়টি নিয়ে তৎপরতা জোরদার করবে। মনে হচ্ছে দ্রুতই দেবে সহায়ক সরকারের রূপরেখা। এই লক্ষ্যে রূপরেখা নিয়ে নানা কথা দলটির পক্ষ থেকে বাজারে ছাড়া হচ্ছে। সংবিধান অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নির্বাহী ক্ষমতা প্রয়োগ না করার শর্তে ছুটিতে থাকবেন প্রস্তাবটাও অপশন হিসেবে বিএনপি মহল থেকে সুকৌশলে প্রচার করা হচ্ছে। তথাকথিত আন্দোলন আর সেই সঙ্গে যড়যন্ত্র-চক্রান্ত যখন কার্যকর হচ্ছে না, এক ও দুই নম্বর নেতা যখন গ্রেপ্তারের রিস্ক নিতে অপারগ, তখন জামায়াতকে সঙ্গে রেখে বিএনপি এখন কী কৌশল ও পদক্ষেপ গ্রহণ করে, সেটাই এখন পর্যবেক্ষণের বিষয়। বিএনপি কি তৃতীয় বারের মতো আবারো নির্বাচনে গিয়ে বিরোধী দলে থাকার রিস্ক নেবে? এই প্রশ্নের উত্তর পেতে দেশবাসীকে অপেক্ষা করা ভিন্ন উপায় নেই।

শেখর দত্ত : রাজনীতিক, কলাম লেখক।