ঢাকা নারীদের জন্য বিশ্বের ৭ম অনিরাপদ স্থান

আগের সংবাদ

বিমানবন্দর থেকে বাসার পথে খালেদা জিয়া

পরের সংবাদ

সাধারণ মানুষ চিকিৎসা পাবে কোথায়?

প্রকাশিত হয়েছে: অক্টোবর ১৮, ২০১৭ , ৮:৪০ অপরাহ্ণ | আপডেট: অক্টোবর ১৮, ২০১৭, ৯:২২ অপরাহ্ণ

সরকারি তিন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কি এ ঘটনার ক্ষেত্রে তাদের দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিয়েছে? হাসপাতালগুলোর এই অবহেলার বিষয়ে সুষ্ঠু তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা নিতে হবে। পাশাপাশি হাসপাতাল-কেন্দ্রিক দালালচক্রকে যে কোনো উপায়ে দমন করতে হবে। তাদের নেপথ্যে যত শক্তিশালী ব্যক্তিরা থাকুক না কেন, তাদের প্রতিহত করতে হবে। হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর থেকে চিকিৎসা শেষ না হওয়া পর্যন্ত একজন রোগী যাতে উৎপাতহীন ও নিরবচ্ছিন্ন চিকিৎসাসেবা পান, এ ব্যবস্থা নিশ্চিত
করতে হবে।

রাজধানীতে একের পর এক তিনটি সরকারি হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার চেষ্টা করেছেন অন্তঃসত্ত্বা পারভীন আখতার। কিন্তু সুযোগ মেলেনি কোথাও। শেষ পর্যন্ত রাস্তাতেই সন্তান প্রসব করতে হলো তাকে। কিন্তু নবজাতককে আর বাঁচাতে পারেননি। ভোরের কাগজসহ গতকালের বিভিন্ন দৈনিকে প্রকাশিত হয় এই মর্মান্তিক ঘটনার খবর।
এ সংক্রান্ত রিপোর্ট জানিয়েছে, গত সোমবার রাত ৩টার দিকে পারভীন আক্তারের ব্যথা শুরু হয়। তখন তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে নেয়ার পর চিকিৎসকরা তাকে পরীক্ষা করে বলেন, তার স্বাভাবিক ডেলিভারি হবে। কিন্তু কিছুক্ষণ পর তারা আবার পরীক্ষা করে জানান, পারভীনের সিজার করাতে হবে। তাদের (ঢামেক) চেয়ে মিটফোর্ড স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ডেলিভারি রোগীর ভালো চিকিৎসা হয়- এসব বলে তারা পারভীনকে মিটফোর্ডে প্রেরণ করেন।

ভোর ৫টার দিকে পারভীনকে মিটফোর্ডে নেয়ার পর তারাও পরীক্ষা করে বলেন, সিজার করতে হবে। কিন্তু তাদের ওখানে ভালো হবে না। তখন তারা পারভীনকে আজিমপুর মাতৃসদন ও শিশু স্বাস্থ্য প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানে নিয়ে যেতে বলেন। সেখান থেকে পারভীনকে সকাল সোয়া ৮টার দিকে মাতৃসদন ও শিশু স্বাস্থ্য প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানে নিয়ে গেলে সেখানে তার নামে কার্ড কিংবা রেজিস্ট্রেশন না থাকায় তারা পারভীনকে ভর্তি নেবে না বলে জানায়। পারভীন আর টিকতে পারছেন না, যে কোনো মুহূর্তে সন্তান প্রসব হয়ে যাবে বলে তাদের অনুরোধ করলে তাকে দোতলার লেবার রুমে নিয়ে যাওয়া হয়। লেবার রুমে নেয়ার পর এক নারী চিকিৎসক এসে বলেন, তার তো সিজার করতে হবে। ১ হাজার ২০০ টাকা থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা লাগবে। রোগী ও তার সঙ্গীর কাছে টাকা নেই বলে জানালে তৎক্ষণাৎ ওই চিকিৎসক চলে যান। এর কিছুক্ষণ পর হাসপাতালের পোশাক পরিহিত এক আয়া এসে পারভীনের হাত ধরে নিচে নামিয়ে দিতে টানাহেঁচড়া করতে থাকেন।

তিনি এখানে চিকিৎসা হবে না বলে আরেকটি প্রাইভেট ক্লিনিকের ঠিকানা ধরিয়ে দিয়ে চলে যেতে বলেন। পারভীন বের হতে না চাইলে গেটের দারোয়ানরা তাকে টেনে বের করে দেন। তখন ৪-৫ কদম যেতেই পারভীন মাটিতে পড়ে যান এবং ব্যথার যন্ত্রণায় চিৎকার করতে থাকেন। এ সময় হঠাৎ করে তার সন্তান প্রসব হয়ে যায়। শিশুটি ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর প্রায় দুই মিনিটের মতো হাত-পা নাড়াচ্ছিল। মিনিট দুয়েক পর শিশুটির দেহ হঠাৎ নিথর দেহের মতো নিস্তেজ হয়ে যায়। বলার অপেক্ষা রাখে না যথাযথ সেবা না পেয়েই নবজাতকের মৃত্যু ঘটেছে।

প্রায় সবকটা জাতীয় দৈনিকই গুরুত্ব দিয়ে ছেপেছে খবরটি। এসব প্রতিবেদনে সরকারি হাসপাতালগুলোর অবহেলাকে দায়ী করা হয়েছে। কপর্দকহীন সাধারণ মানুষ বলে পারভীনকে গুরুত্ব দেয়া হয়নি। তাকে চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। চিকিৎসা মানুষের একটি মৌলিক অধিকার। এ ঘটনায় এ প্রশ্ন এসেই যায় যে, আমাদের রাষ্ট্র ব্যবস্থা গণমানুষের এ অধিকার পূরণে কতটা যত্নবান? দেশের চিকিৎসা খাতে জনগণের ট্যাক্সের অর্থ থেকে উল্লেখযোগ্য অংশ বরাদ্দ দেয়া হয় জাতীয় বাজেটে। তারপরও দেশের সাধারণ মানুষের কল্যাণে চিকিৎসা খাত কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে তা পারভীনের ঘটনায় বুঝা যায়। পারভীনের ঘটনায় কর্তৃপক্ষ পৃথক দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। ঘটনার সত্যতা স্বীকার করেছে আজিমপুর মাতৃসদন ও শিশুস্বাস্থ্য প্রশিক্ষণ কর্তৃপক্ষ। তারা বলছে, হাসপাতালে পারভীনকে চিকিৎসা দেয়া হলেও পরে তিনি দালালের খপ্পরে পড়েছিলেন। ফলে এমন দুর্ঘটনা ঘটে।

এটা স্পষ্ট যে, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ দালালের দোহাই দিয়ে নিজেদের দায় সারছেন। দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোতে দালাল চক্রের দৌরাত্ম্য সম্পর্কে সবার জানা। এই দালাল ও তার দোসররা দেশে চিকিৎসা ব্যবস্থা কলুষিত করছে এটাও সত্য। কিন্তু সরকারি তিন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কি এ ঘটনার ক্ষেত্রে তাদের দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিয়েছে? হাসপাতালগুলোর এই অবহেলার বিষয়ে সুষ্ঠু তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা নিতে হবে। পাশাপাশি হাসপাতাল-কেন্দ্রিক দালালচক্রকে যে কোনো উপায়ে দমন করতে হবে। তাদের নেপথ্যে যত শক্তিশালী ব্যক্তিরা থাকুক না কেন, তাদের প্রতিহত করতে হবে। হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর থেকে চিকিৎসা শেষ না হওয়া পর্যন্ত একজন রোগী যাতে উৎপাতহীন ও নিরবচ্ছিন্ন চিকিৎসাসেবা পান, এ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। পারভীনের ঘটনায় দায়ীদের শনাক্ত করে আইনানুগ শাস্তির আওতায় আনতে হবে।