স্বপ্নের সেতু ও শেখ হাসিনা

আগের সংবাদ

আশ্রিত রোহিঙ্গাদের বায়োমেট্রিক নিবন্ধন চলছে

পরের সংবাদ

স্ব-ভূমে সসম্মানে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবর্তন হোক

প্রকাশিত হয়েছে: অক্টোবর ৮, ২০১৭ , ৯:০৮ অপরাহ্ণ | আপডেট: অক্টোবর ১১, ২০১৭, ৩:৪৪ অপরাহ্ণ

মোনায়েম সরকার

কলাম লেখক

মোনায়েম সরকার

পৃথিবী প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হচ্ছে, পরিবর্তিত হচ্ছে বিশ্বের ভৌগোলিক বলয়। একদিন যেসব জাতিগোষ্ঠী বীরদর্পে পৃথিবীকে শাসন করত, আজ তারা অনেকে নিজের অস্তিত্ব রক্ষা করতেই অস্থির। এ প্রসঙ্গে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের উদাহরণ দেয়া যেতেই পারে। তাদের সাম্রাজ্যে একদিন সূর্যাস্ত যেত না- আজ যায়। এটাই নিয়ম। পরিবর্তন বা বিবর্তন এভাবেই হয়। আজ যারা আশ্রয়হীন কাল তারা রাজা-মহারাজা হবে, আজ যারা রাজা-মহারাজা আছে কাল তারা ভিক্ষা করবে। ইতিহাসের পাতায় আমরা দেখতে পাই যে, স্পানিস, ফরাসি, পর্তুগিজ, গ্রিক, রোমানÑ কোনো সাম্রাজ্যযই তিনশ’ বছরের বেশি টিকেনি, ব্যতিক্রম কেবল মোঘল সাম্রাজ্য।

পৃথিবীর দেশে দেশে আজ নানারকম সংকট তৈরি হচ্ছে। এই সংকট কতগুলো অভ্যন্তরীণ সৃষ্ট, কতগুলো বহির্বিশ্বের ক‚টচাল দ্বারা প্রভাবিত। কাশ্মির ইস্যু, প্যালেস্টাইন ইস্যু, বসনিয়া হার্জেগোভিনা ইস্যুর কথা অনেকেই জানি। বর্তমানের স্পেনের সমৃদ্ধ অঞ্চল কাতালোনিয়ার স্বাধীনতার পক্ষে ভোট দিয়েছে ৯০ শতাংশ মানুষ। স্পেন যতই চেষ্টা করুক কিছুতেই ঠেকাতে পারবে না। কাতালোনিয়ার স্বাধীনতা এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। বছরের পর বছর ধরে এসব স্থানে হত্যাকান্ড ও সহিংসতা চলছে। মধ্যপ্রাচ্যের ১৯৮২ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর সাবরা ও শাতিলার

ফিলিস্তিন শরণার্থী শিবিরে চালানো গণহত্যার কথাও জানি। খ্রিস্টান মিলিশিয়া ইহুদিদের প্ররোচনায় সেদিন যে হত্যাযজ্ঞ ঘটিয়েছিল মুসলিম নারী, শিশু ও বৃদ্ধদের ওপর তা অবর্ণনীয়।
বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় পুঁজিবাদী ও সাম্রাজ্যযবাদী শক্তি দেশে দেশে নানারকম সংকট তৈরি করে নিজেদের ফায়দা লোটার অবিরাম চেষ্টা করছে। এর পেছনে অর্থনৈতিক কারণ আছে, আছে ক‚টনৈতিক ও জিওপলিটিক্যাল কারণ। পুঁজিবাদীরাই মারণাস্ত্র বানায়। সেই অস্ত্র বিক্রির জন্য তারা নানামুখী সমস্যা তৈরি করে। এমনকি জেনোসাইড বা এথনিক ক্লিনজিং ঘটাতেও তারা দ্বিধান্বিত হয় না। পুঁজিবাদীর কাছে মানুষের চেয়ে মুদ্রার দাম বেশি। তারা মানুষের চেয়ে মুদ্রাকে মূল্যবান ও প্রিয় মনে করে। মুদ্রার জন্য তারা অবলীলায় মানবতা বিসর্জন দেবে এতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই।
সম্প্রতি রোহিঙ্গা সমস্যা সারা বিশ্বে তোলপাড় সৃষ্টি করেছে। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে, লাখে লাখে উদ্বাস্তু রোহিঙ্গা নরনারী এসে আশ্রয় নিয়েছে বাংলাদেশে। বাংলাদেশ একটি ছোট দেশ হওয়া সত্তে¡ও যেভাবে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা নর-নারীর পাশে মানবিকতার হাত প্রসারিত করে দাঁড়িয়েছে তার কোনো তুলনা হয় না। কেন বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের পাশে এভাবে দয়ার্দ্র হৃদয় নিয়ে দাঁড়াল তার অনেক কারণ আছে। এই কারণগুলোর মধ্যে সবচেয়ে প্রধান কারণ হলো- ১৯৭১ সালে আমরাও শরণার্থী হয়েছিলাম।

পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে সেদিন আমরা আশ্রয় নিয়েছিলাম প্রায় এক কোটি মানুষ। দীর্ঘ নয়টি মাস ভারত আমাদের আশ্রয় দিয়ে, খাদ্য দিয়ে, সেবা দিয়ে বাঁচিয়ে রেখেছিল। সেদিনের শরণার্থী শিবিরে আমরা যারা ছিলাম আজ তারা নিশ্চয়ই উপলব্ধি করতে পারছি ১৯৭১ সালে শরণার্থী বাঙালির যে দুর্দশা-দুর্ভোগ ছিল, ২০১৭ সালে এসে রোহিঙ্গারাও পড়েছে একই রকম সংকটের মুখে।

রোহিঙ্গাদের পাশে দাঁড়ানোর আরেকটি কারণ হলো, আজ যে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য নিয়ে আমরা গর্ব করছি সারা পৃথিবীতে, একদিন সেই সাহিত্যের মানবিক বীজ আরাকানে (বর্তমানে রাখাইন) রোপণ হয়েছিল। মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্য আরাকানে প্রচার প্রসার লাভ করে মঙ্গলকাব্যের একঘেয়েমি থেকে ভিন্ন স্বাদ এনে দিয়েছিল। অন্য যে কারণটি গুরুত্বপূর্ণ বলে আমি বিবেচনা করি, সেটা হলো আমাদের ক‚টনৈতিক সম্পর্কের ‘মূলনীতি’। বাংলাদেশ ক‚টনৈতিকভাবে বিশ্বাস করে কারো সঙ্গে শত্রুতা নয়, সবার সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রেখেই সমস্যার সমাধান করতে হবে। এই কারণেও রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশ তার ক‚টনৈতিক আদর্শ সমুন্নত রেখেছে বলে আমি মনে করি।

মাঝে মাঝে পরিবারের সদস্যদের মধ্যেও ভুল বোঝাবুঝি হয়, তখন প্রতিবেশীর গৃহে গিয়ে আশ্রয় নেয় কোনো কোনো অসহায় সদস্য। এর পরে সমস্যা সৃষ্টি হওয়া পরিবার ও প্রতিবেশী পরিবারের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক আলোচনা হয়, মিটমাট হয় উদ্ভ‚ত সমস্যা। মিয়ানমার ও বাংলাদেশও এখন সেই অবস্থার মধ্যেই আছে। মিয়ানমারে একটি সাময়িক সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে। মিয়ানমারের লাখ লাখ অসহায় লোক এসে আশ্রয় নিয়েছে বাংলাদেশে। বাংলাদেশ সাধ্য মতো চেষ্টা করছে মিয়ানমারের জনগণ মিয়ানমারের হাতে তুলে দিতে। যতদিন আমরা তাদের সসম্মানে তুলে দিতে না পারি ততদিন তার অসহায় জনগণকে আমাদের আশ্রয়, খাদ্য, সেবা-শুশ্রƒষা দিয়ে বাঁচিয়ে রাখতেই হবে।

পত্র-পত্রিকায় দেখছি, রোহিঙ্গা গণহত্যার অনেক রকম সংবাদ। আজকের এই আধুনিক ও মানবতাবাদী সমাজ কাঠামোর ভেতর থেকে কীভাবে এমন নারকীয় গণহত্যা চলতে পারে তা ভেবেই পাই না। বাংলাদেশ আন্তরিকভাবে চেষ্টা করছে রোহিঙ্গাদের শরণার্থী মিয়ানমারে ফিরিয়ে দিতে। হয়তো খুব দ্রুতই এই সমস্যা সমাধান হবে, কিন্তু ততক্ষণ পর্যন্ত বাংলাদেশের প্রত্যেকটি মানুষকে অত্যন্ত ধৈর্য ও বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিতে হবে।

আজ রোহিঙ্গারা স্বভ‚মি থেকে উদ্বাস্তু হতে পারে, কিন্তু আগামীকাল তারাই হতে পারে মানুষের মঙ্গলকর্তা। ইতোমধ্যে মিয়ানমার তার দৃঢ় অবস্থান থেকে কিছুটা সরে এসেছে বৈশ্বিক চাপে। আমরা আশা
করব, মিয়ানমার শুভবুদ্ধির পরিচয় দেবে, একটি সুন্দর
সমাধানের পথেই হাঁটবে শান্তিকামী মিয়ানমার।

রোহিঙ্গারা আজ নির্যাতিত, নিপীড়িত এ কথা মিথ্যা নয়। আমরাও একদিন নির্যাতন, নিপীড়ন সহ্য করেছি। দীর্ঘ তেইশ বছর লড়াই-সংগ্রাম করে স্বাধীনতা লাভ করেছি। আমরা যখন স্বাধীনতার জন্য ছটফট করছিলাম তখন বিশ্বের অনেক ক্ষমতাধর রাষ্ট্র, যেমন আমেরিকা, চীন বিরোধিতা করেছে। তারা চায়নি আমরা মুক্ত-স্বাধীন স্বদেশে মানুষের অধিকার নিয়ে মানুষের মতো বাঁচি। রোহিঙ্গাদের সংকটও অনেকটা আমাদেরই মতো। চীনা বিনিয়োগের ‘চুম্বুকক্ষেত্র’ বলে রাখাইন অঞ্চলকে মনে করা হয়।

চীন রাখাইনে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে। রাখাইন অধিবাসীদের যদি কৌশলে অন্যত্র সরিয়ে দেয়া যায় বা নিধন করে শেষ করে দেয়া যায় তাহলে চীনের পথের কাঁটা দূর হয়। সিনেমায় বস্তি উচ্ছেদ করে বড়লোকদের কারখানা বানানোর দৃশ্য প্রায়ই চোখে পড়ে। রাখাইন রাজ্যেও চীন সেই দৃশ্যের নাটক সাজিয়েছে যেন। আজ রোহিঙ্গারা লড়াই করছে নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য। স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকার জন্য। একদিন না একদিন তাদের এই ঐক্যবদ্ধ লড়াই সার্থকতা খুঁজে পাবেই।

ক্রমপরিবর্তনশীল পৃথিবীর ইতিহাস বলছে- একটি জাতিগোষ্ঠী যখন তাদের ন্যায্য অধিকার আদায়ের জন্য ঐক্যবদ্ধভাবে ও নিয়মতান্ত্রিক পদ্ধতিতে লড়াই শুরু করে, তখন পৃথিবীর কোনো শক্তিই তাদের কাক্সিক্ষত স্বপ্নকে হত্যা করতে পারে না। হয়তো এ জন্য তাদের অনেক ত্যাগ স্বীকার করতে হয়। ভয়ঙ্কর মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়তে হয়, কিন্তু পরিণামে তারাই হয় জয়ী। রোহিঙ্গারা কেন, কী কারণে বারবার নিজ বাসভ‚মি থেকে বাস্তুচ্যুত হচ্ছে তা আজ সবারই জানা। বিশ্বের সব মানুষই আজ তাদের ব্যথায় সমবেদনা জানাচ্ছেÑ তাদের নির্বিঘেœ জীবনযাপনের জন্য, নিরাপত্তার জন্য বিক্ষোভ প্রদর্শন করছে। এটাকে আমি রোহিঙ্গা সংগ্রামের একটি বিজয়পালক বলেই মনে করি।

উগ্রপন্থা দিয়ে পৃথিবীতে কখনোই শান্তি আনা যাবে না। এক সময় বামপন্থীরা উগ্রপন্থা ব্যবহার করে পৃথিবীতে সমাজতন্ত্রের বাতাবরণ তৈরি করতে চেয়েছে কিন্তু ব্যর্থ হয়েছে। মৌলবাদী ধর্মান্ধ জঙ্গি সংগঠন আলকায়েদা, আইএসও উগ্রপথে হেঁটে আজ নিশ্চিহ্ন হওয়ার পরে। বাংলাদেশেও চারদলীয় জোট সরকারের আমলে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় মৌলবাদী উগ্রপন্থীরা মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছিল, বর্তমান শেখ হাসিনা সরকার শক্ত হাতে জঙ্গিবাদীদের দমন করে পৃথিবীতে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। উগ্রপন্থা পরিহার করে শান্তির পথে হাঁটতে হবে। যুদ্ধবিগ্রহ করে শান্তি আনা যায় না, তার প্রকৃষ্ট প্রমাণ আফগানিস্তান, ইরাক, লিবিয়া, সিরিয়া, মিসর ইত্যাদি দেশ। মানুষ যদি তার মনুষ্যত্ব জাগাতে না পারে, তাহলে পৃথিবী ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যেতে বাধ্য। আমরা অনেক রক্ত দেখেছি, অনেক মৃত্যু দেখেছি- মা-বোনের চোখে দেখেছি বিরামহীন অশ্রু ও কান্না। এসব আর দেখতে চাই না।

স্নায়ুযুদ্ধ (Cold war) এ সময়ের বাস্তবতায় জুজুর ভয়ে পরিণত হয়েছে। পৃথিবীর বৃহৎ শক্তিসম্পন্ন পুঁজিবাদী দেশগুলো একের পর এক অত্যাধুনিক মারণাস্ত্র বানাচ্ছে। এগুলো বিক্রির জন্য তারা দেশে দেশে জঙ্গি সৃষ্টি, গৃহযুদ্ধ বাঁধানো, অভ্যন্তরীণ সংকটসহ নানারকম সংকট তৈরি করে যাচ্ছে। সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে পুঁজিবাদী দেশগুলো শোষণের যে অভিনব কৌশল গ্রহণ করেছে তা কখনো স্থায়ী হবে না। বর্তমান পৃথিবী একটি মানবিক বিশ্বব্যবস্থা (Human World Order) আকাক্সক্ষা করছে। স্বৈরশাসক, একনায়ক, রাজতন্ত্র, সামরিকতন্ত্রÑ এসব আজ আর কারো পছন্দ নয়। যথার্থ গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ যখন মানুষের মধ্যে জাগ্রত হবে তখন সমস্ত অন্যায়, সমস্ত দুঃশাসন ভেঙে খান খান হয়ে যাবে। আজ রোহিঙ্গারা স্বভ‚মি থেকে উদ্বাস্তু হতে পারে, কিন্তু আগামীকাল তারাই হতে পারে মানুষের মঙ্গলকর্তা। ইতোমধ্যে মিয়ানমার তার দৃঢ় অবস্থান থেকে কিছুটা সরে এসেছে বৈশ্বিক চাপে। আমরা আশা করব, মিয়ানমার শুভবুদ্ধির পরিচয় দেবে, একটি সুন্দর সমাধানের পথেই হাঁটবে শান্তিকামী মিয়ানমার।

মোনায়েম সরকার : কলাম লেখক।